• বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০২:৩৩ অপরাহ্ন
হেডলাইন :
জুড়ীতে পোষা হাতির মালিকদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত জুড়ীতে পোষা হাতির মালিকদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে রায়পুরায় খাল খননসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের শিগগিরই উদ্বোধন হবে-ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল এমপি সুন্দরবনে জোংড়া খাল এলাকায় বন বিভাগের অভিযান ৪টি নৌকা ও শুটকি তৈরির সরঞ্জাম জব্দ নাসিমা হত্যাকান্ডে গ্রেফতার তান্ত্রিক শামসুল হক ‎বরিশালে MEP গ্রুপের বিভাগীয় বিক্রয় প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত বেনাপোলের ভারতীয় সীমান্তে দুই দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে নারী-শিশুসহ ১২ জনকে পুশ-ইন চেষ্টায় ব্যর্থ-বিএসএফ। সতর্ক অবস্থানে (বিজিবি) চাঁদা না পেয়ে ঘের লুট ও ভাংচুর করলেন স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা

বহুমুখী চাপে অর্থনীতি—অগ্রাধিকার নির্ধারণেই উত্তরণের চাবিকাঠি

মো. সহিদুল ইসলাম সুমন / ৪৩ দেখেছেন
আপলোড : শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

দেশের অর্থনীতি আজ একসঙ্গে একাধিক চাপের মুখে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, মানুষের প্রকৃত আয় কমছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত, বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি ও বৈদেশিক খাতের অনিশ্চয়তা। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা এখন নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাস্তবতা হলো, অর্থনীতি আগে থেকেই দুর্বল ছিল; এখন সেই দুর্বলতার ওপর একের পর এক চাপ এসে পড়েছে। গত তিন বছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে। প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সেই তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি।
মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয় বেড়েছে বেশি। এর ফলে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে সংকুচিত করছে। চাহিদা কমলে উৎপাদন কমে, বিনিয়োগ কমে—অর্থনীতি এক ধরনের স্থবিরতার দিকে এগোয়। ইতোমধ্যে সেই লক্ষণ স্পষ্ট।
অন্যদিকে সরকার এক ধরনের নীতিগত উভয়সংকটে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়াতে হয়, কিন্তু এতে বিনিয়োগ কমে যায়, বাড়ে বেকারত্ব। আবার কর্মসংস্থান বাড়াতে চাইলে অর্থ সরবরাহ বাড়াতে হয়, যা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দেয়। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই সরকারকে ভারসাম্য খুঁজে নিতে হবে। কোনো একটি লক্ষ্যকে এককভাবে অগ্রাধিকার দিলে সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আর্থিক খাতের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে—মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খেলাপি। কয়েকটি ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে সরকারকে সরাসরি সহায়তা দিতে হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা আরও সংকুচিত হয়েছে। একই সময়ে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় বাজেট ঘাটতি বাড়ছে, যা অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে।
বৈদেশিক খাত আপাতত কিছুটা স্বস্তি দিলেও ঝুঁকি রয়ে গেছে। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দুর্বল। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়বে আমদানি ব্যয়ে, বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ। টাকার অবমূল্যায়ন হলে মূল্যস্ফীতিও আরও বাড়বে। আবার জ্বালানিতে ভর্তুকি বাড়ালে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাবে—এ এক সুস্পষ্ট নীতিগত দোলাচল।
দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। সর্বশেষ হিসাবে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ শতাংশের ওপরে উঠেছে। প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে। আয় বৈষম্যও বেড়েছে উদ্বেগজনক মাত্রায়—জাতীয় আয়ের বড় অংশ সীমিত একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত। এতে মধ্যবিত্ত শ্রেণি দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কর্মসংস্থানের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। উচ্চ প্রবৃদ্ধির সময়েও যে “কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি” দেখা গেছে, তা এখন আরও প্রকট। শিল্প খাত বাড়লেও কর্মসংস্থান কমেছে, বিপুলসংখ্যক তরুণ কাজ পাচ্ছেন না। নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণও কমছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি নেতিবাচক সংকেত।
বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগও হ্রাস পেয়েছে। এর পেছনে শুধু সুদহার নয়, বরং আস্থার সংকটই বড় কারণ। নীতির অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন একটাই—সরকার কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেবে? বাস্তবতা হলো, কোনো একটি সমস্যার সমাধান এককভাবে সম্ভব নয়। বরং একটি সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন, যেখানে স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার একসঙ্গে এগোবে।
প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ এটি সরাসরি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে এবং অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিকে দুর্বল করে। মুদ্রানীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রয়োগ ছাড়া এটি সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে গভীর সংস্কার অপরিহার্য। খেলাপি ঋণ কমানো, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর্থিক খাত শক্তিশালী না হলে অর্থনীতির অন্য খাতগুলোও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
তৃতীয়ত, বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার খরচ ও সময় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
চতুর্থত, রাজস্ব আয় বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কার ছাড়া সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে না। এতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়বে।
পঞ্চমত, জ্বালানি খাতকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে, অন্যথায় এই খাত ভবিষ্যতেও বড় ঝুঁকি হয়ে থাকবে।
সবশেষে, অর্থনীতির এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—সাহসী সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়ন। সংকট অস্বীকার করে সময়ক্ষেপণ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। বরং এটিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে কাঠামোগত সংস্কার শুরু করাই এখন সময়ের দাবি।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন বড়, তেমনি সুযোগও আছে। সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও সুসংগঠিত নীতির মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এখন দেখার বিষয়—সরকার সেই কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে কতটা প্রস্তুত।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..