• বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০১:৩৭ অপরাহ্ন
হেডলাইন :
জুড়ীতে পোষা হাতির মালিকদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত জুড়ীতে পোষা হাতির মালিকদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে রায়পুরায় খাল খননসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের শিগগিরই উদ্বোধন হবে-ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল এমপি সুন্দরবনে জোংড়া খাল এলাকায় বন বিভাগের অভিযান ৪টি নৌকা ও শুটকি তৈরির সরঞ্জাম জব্দ নাসিমা হত্যাকান্ডে গ্রেফতার তান্ত্রিক শামসুল হক ‎বরিশালে MEP গ্রুপের বিভাগীয় বিক্রয় প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত বেনাপোলের ভারতীয় সীমান্তে দুই দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে নারী-শিশুসহ ১২ জনকে পুশ-ইন চেষ্টায় ব্যর্থ-বিএসএফ। সতর্ক অবস্থানে (বিজিবি) চাঁদা না পেয়ে ঘের লুট ও ভাংচুর করলেন স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা

মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার, নীতির বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের পথরেখা

মো. সহিদুল ইসলাম সুমন / ৪২ দেখেছেন
আপলোড : শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস—মহান মে দিবস—শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্যতার সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক। ১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে-মার্কেটের রক্তঝরা ইতিহাস মানবজাতিকে এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—শ্রমিকের অধিকার কখনো দয়া করে দেওয়া হয়নি, তা সংগ্রামের মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়েছে। সেই চেতনা ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিবসকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে অতীতের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের পথরেখা নির্ধারণ করা জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড শ্রমজীবী মানুষ। কৃষি, শিল্প, তৈরি পোশাক, পরিবহন, নির্মাণ কিংবা প্রবাস—সবখানেই শ্রমিকদের ঘাম ও শ্রমে গড়ে উঠেছে উন্নয়নের ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই শ্রমজীবী শ্রেণির একটি বড় অংশ এখনও ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শ্রমিক অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সরকারের ভূমিকা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন, বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সরকারের সময় গৃহীত উদ্যোগগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনার দাবি রাখে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী কঠিন বাস্তবতায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শন গ্রহণ করেন, তার কেন্দ্রে ছিল উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ। “গ্রামই শক্তি”—এই ধারণাকে সামনে রেখে তিনি গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমনির্ভর কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করেন। খাল খনন, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ—এসব কর্মসূচি শুধু অবকাঠামো উন্নয়নই করেনি, বরং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হয়েছে এবং শহরমুখী শ্রমচাপ কিছুটা হলেও কমেছে।

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিসিকের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদানের ফলে নতুন শ্রমবাজার তৈরি হয়। নিম্নআয়ের মানুষও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলে।

জিয়াউর রহমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে তিনি যে দিগন্ত উন্মোচন করেন, তা আজকের রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি। প্রবাসী শ্রমিকদের এই অবদান দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সরকার শ্রমবাজার সম্প্রসারণ ও শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক (RMG) খাতের বিকাশে নীতিগত সহায়তা দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই খাত লক্ষাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, যার একটি বড় অংশ নারী শ্রমিক। এর ফলে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক কাঠামোয় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।

এই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করা। মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম সক্রিয় করার মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্পখাতে মজুরি নির্ধারণ ও পুনর্বিবেচনার একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া গড়ে ওঠে। যদিও এই মজুরি সবসময় জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না, তবুও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত অগ্রগতি।

শ্রম আইন সংস্কারের ক্ষেত্রেও এই সময়কাল উল্লেখযোগ্য। বিচ্ছিন্ন শ্রম আইনগুলোকে একীভূত করে একটি সমন্বিত শ্রম আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে ২০০৬ সালের শ্রম আইনে রূপ নেয়। এতে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, ছুটি, নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত হয়। এটি শ্রমিক অধিকার রক্ষায় একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।

বিএনপি সরকারের সময় শ্রম আদালতগুলোর কার্যক্রমকে গতিশীল করা, শ্রমিক-নিয়োগকর্তা বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সহজতর করা এবং শ্রম অধিদপ্তরের কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগও উল্লেখযোগ্য ছিল। এর ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়।

প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণেও নেওয়া হয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিলের কার্যক্রম সম্প্রসারণ, প্রবাসীদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান শ্রমিকদের জন্য একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TTC) এবং বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে তুলনামূলক স্বাধীনতা এবং শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া সংগঠিতভাবে উপস্থাপনের সুযোগও বৃদ্ধি—এই সময়ের একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং এই ক্ষেত্রে কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়। তবে এসব অর্জনের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও ছিল। শ্রম আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতা, কর্মপরিবেশের নিরাপত্তাহীনতা, মজুরি বৈষম্য এবং শিল্পখাতে তদারকির ঘাটতি শ্রমিকদের প্রত্যাশা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নীতিগত অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল—এটি স্বীকার করা জরুরি।

বর্তমান বিশ্বে শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গিগ অর্থনীতির বিস্তার শ্রমিকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হলে সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণ অপরিহার্য।

এই প্রেক্ষাপটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় সামনে আসে। প্রথমত, শ্রম আইন বাস্তবায়নে কঠোরতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের জন্য একটি সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনঃপ্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে, যাতে শ্রমিকরা পরিবর্তিত শ্রমবাজারে টিকে থাকতে পারে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, শ্রমিক-নিয়োগকর্তা সম্পর্ককে অংশীদারিত্বমূলক করতে হবে।

রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ক্ষেত্রেও বাস্তবায়নের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ইশতেহারে শ্রমিক কল্যাণে যে প্রতিশ্রুতিগুলো দেওয়া হয়েছে—ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা—তা বাস্তবায়িত হলে শ্রমজীবী মানুষের জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, শ্রমিক কল্যাণ কোনো দলীয় ইস্যু নয়; এটি একটি জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সরকারের সময় যে উৎপাদনমুখী, কর্মসংস্থানভিত্তিক এবং শ্রমবান্ধব নীতির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেই ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে হলে প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

মহান মে দিবসের এই প্রেক্ষাপটে আমাদের অঙ্গীকার হোক—শ্রমিকের অধিকার যেন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয়। শ্রমিকের ঘাম যেন সম্মানের সঙ্গে মূল্যায়িত হয়। তাহলেই প্রকৃত অর্থে মে দিবসের চেতনা বাস্তবায়িত হবে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: mislam.sumon@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..