আগামী জাতীয় বাজেটকে ঘিরে দেশের সর্বত্র যেমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যেও রয়েছে কিছু স্বতন্ত্র ও জরুরি দাবি। ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, জাতিগত বহুত্ব, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-বৈষম্যের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের বাজেট প্রত্যাশা নিছক আর্থিক বরাদ্দের প্রশ্ন নয়; এটি তাদের অধিকার, অস্তিত্ব এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের দাবি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশ জুড়ে বিস্তৃত হলেও জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় এ অঞ্চলের গুরুত্ব অনেক সময়ই প্রান্তিক হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের ক্ষেত্রে এখানকার মানুষ এখনো বৈষম্যের শিকার। এই প্রেক্ষাপটে আগামীর বাজেট হওয়া উচিত এমন, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা, সম্ভাবনা এবং জনগণের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করবে।
প্রথমত, অবকাঠামো উন্নয়ন পার্বত্য অঞ্চলের প্রধান চাহিদাগুলোর একটি। দুর্গম পাহাড়ি পথ, সীমিত সড়ক যোগাযোগ এবং মৌসুমি দুর্ভোগ এখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় বাধা। তাই বাজেটে সড়ক, সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। শুধু বড় প্রকল্প নয়, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে ছোট ছোট সংযোগ সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারেও গুরুত্ব দিতে হবে। এতে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সহজ হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা খাতে বৈষম্য দূরীকরণ অত্যন্ত জরুরি। পার্বত্য অঞ্চলের অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত স্কুল-কলেজ নেই, শিক্ষক সংকট রয়েছে এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ সীমিত। বাজেটে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালুর জন্য আলাদা প্রকল্প, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, এবং আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ থাকতে হবে।এর পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো উন্নয়নেও নজর দিতে হবে। শিক্ষা শুধু জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষারও হাতিয়ার।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন পার্বত্য জনগণের অন্যতম প্রধান দাবি। দুর্গমতার কারণে অনেক এলাকায় এখনো আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছেনি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। বাজেটে মোবাইল মেডিকেল টিম, টেলিমেডিসিন সেবা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
চতুর্থত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতি এখনো মূলত কৃষি, জুমচাষ ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। তবে পর্যাপ্ত প্রযুক্তি, বাজার সুবিধা ও প্রশিক্ষণের অভাবে এই খাতগুলো সম্ভাবনা অনুযায়ী বিকশিত হতে পারেনি। বাজেটে কৃষি আধুনিকীকরণ, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, বাঁশ ও কাঠভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প এবং পর্যটন খাত উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে স্থানীয় যুবকদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি, যাতে তারা নিজ এলাকায় থেকেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।
পঞ্চমত, পার্বত্য অঞ্চলে টেকসই পর্যটন উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এবং পাহাড়ি জীবনযাত্রা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে। কিন্তু পরিকল্পনাহীন পর্যটন পরিবেশ ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই বাজেটে পরিবেশবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং প্রশিক্ষণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ষষ্ঠত, ভূমি সমস্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি দীর্ঘস্থায়ী ও স্পর্শকাতর ইস্যু। ভূমির মালিকানা, রেকর্ড ও বিরোধ নিষ্পত্তি নিয়ে জটিলতা রয়েছে, যা সামাজিক অস্থিরতারও কারণ। বাজেটে ভূমি কমিশনকে কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। ভূমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সপ্তমত, পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাজেট আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত। চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নে বা পুনর্মূল্যায়নে আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রয়োজন। আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে আরও কার্যকর করতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ জরুরি।
অষ্টমত, ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণও এখন সময়ের দাবি। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পার্বত্য অঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বাজেটে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, ই-গভর্নেন্স সেবা সম্প্রসারণ এবং আইসিটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
নবমত, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা। পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও ভূমিধস, বন উজাড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মুখে। বাজেটে বন সংরক্ষণ, পুনঃবনায়ন, এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দশমত, নারীর ক্ষমতায়ন। পার্বত্য অঞ্চলের নারীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। বাজেটে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও ভাষা সংরক্ষণেও বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একাদশতম, পার্বত্য এলাকায় সৌর বিদ্যুৎ (Solar Power) খুবই কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত একটি সমাধান, বিশেষ করে যেখানে গ্রিড বিদ্যুৎ পৌঁছানো কঠিন বা ব্যয়বহুল। তাই বাজেটে পাহাড়ে সৌর বিদ্যুতায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।
সবশেষে, বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের মতামত গ্রহণ করে বাজেট পরিকল্পনা করা হলে তা হবে বাস্তবমুখী ও কার্যকর। কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো পরিকল্পনা নয়, বরং স্থানীয় বাস্তবতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে গৃহীত উদ্যোগই পারে এই অঞ্চলের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে।
সমগ্র বিবেচনায় বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ এমন একটি বাজেট প্রত্যাশা করে, যা হবে ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই উন্নয়নের পথপ্রদর্শক। এই বাজেট শুধু অর্থ বরাদ্দের হিসাব নয়; এটি হবে একটি প্রতিশ্রুতি—যেখানে দেশের প্রতিটি নাগরিক, তার ভৌগোলিক অবস্থান বা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে, সমান সুযোগ ও মর্যাদা পাবে। যদি সরকার এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে এবং সেই অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন করে, তবে পার্বত্য চট্টগ্রামও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের মূলধারায় দৃঢ়ভাবে যুক্ত হতে পারবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com