• বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০১:৩৮ অপরাহ্ন
হেডলাইন :
জুড়ীতে পোষা হাতির মালিকদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত জুড়ীতে পোষা হাতির মালিকদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে রায়পুরায় খাল খননসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের শিগগিরই উদ্বোধন হবে-ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল এমপি সুন্দরবনে জোংড়া খাল এলাকায় বন বিভাগের অভিযান ৪টি নৌকা ও শুটকি তৈরির সরঞ্জাম জব্দ নাসিমা হত্যাকান্ডে গ্রেফতার তান্ত্রিক শামসুল হক ‎বরিশালে MEP গ্রুপের বিভাগীয় বিক্রয় প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত বেনাপোলের ভারতীয় সীমান্তে দুই দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে নারী-শিশুসহ ১২ জনকে পুশ-ইন চেষ্টায় ব্যর্থ-বিএসএফ। সতর্ক অবস্থানে (বিজিবি) চাঁদা না পেয়ে ঘের লুট ও ভাংচুর করলেন স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা

দাম বাড়ার দুষ্টচক্রে জনজীবন মো. সহিদুল ইসলাম সুমন

মো. সহিদুল ইসলাম সুমন / ১২৯ দেখেছেন
আপলোড : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি এখন এমন এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, যা কেবল অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষ আজ অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের দিকে। আয় বাড়ছে না, কিন্তু ব্যয় বাড়ছে অবিশ্বাস্য গতিতে। ফলে নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তের জীবনও ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, এপ্রিলে দেশে মূল্যস্ফীতির হার আবারও ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। মার্চে যা ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ, কিছুদিনের সাময়িক স্বস্তির পর মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরে গেছে।
মূল্যস্ফীতির এ চিত্র শুধু পরিসংখ্যানগত উদ্বেগ নয়; এর প্রতিটি সংখ্যা সাধারণ মানুষের কষ্টের প্রতিফলন। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস—সব কিছুর দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন ভাড়া, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় ও শিক্ষার খরচ। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরেই ব্যয়ের চাপ বাড়ছে।
মূল্যস্ফীতির এই নতুন ধাক্কার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে সরকার এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে দেশে জ্বালানি তেলের দাম ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খরচে এবং পরোক্ষভাবে প্রায় সব পণ্যের বাজারে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রী, ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইলসহ খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামও বেড়েছে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা অভ্যন্তরীণ বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকট, বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন—সব মিলিয়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার অবমূল্যায়ন। কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৮৫ টাকার আশেপাশে, এখন তা ১১০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে আমদানিকৃত প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকও সতর্ক করেছে যে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম গড়ে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এডিবিও বলেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ বিঘ্নের কারণে আগামী অর্থবছরেও বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশে থাকতে পারে।
তবে শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে দায়ী করলেই দায় শেষ হয় না। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা, মজুতদারি, সিন্ডিকেট ও অকার্যকর বাজার তদারকিও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির বড় কারণ। প্রায়ই দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়ে না। বরং অজুহাত তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে অস্বাভাবিক মূল্য ব্যবধান তৈরি করেছে। ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, আবার ভোক্তাও কম দামে পণ্য কিনতে পারছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান একটি পত্রিকার সাক্ষাতকারে যথার্থই বলেছেন, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যবস্থাপনা, বিনিময় হার, জ্বালানি ব্যয়, বাজার তদারকি ও সামাজিক সুরক্ষাকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। কারণ বর্তমান মূল্যস্ফীতি কেবল চাহিদাজনিত নয়; এটি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধিজনিত “কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন”-এ পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে দেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতাও মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। অতিরিক্ত তারল্য ও অনিয়ন্ত্রিত ঋণপ্রবাহ বাজারে অর্থের জোগান বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। কার্যকর মুদ্রানীতি প্রয়োগে বিলম্ব এবং নীতিগত দ্বিধাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। বাস্তব মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম হওয়ায় মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। বিবিএসের তথ্য বলছে, শ্রমিকের মজুরি কিছুটা বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, সঞ্চয় হ্রাস পাচ্ছে এবং ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। অনেক পরিবার এখন পুষ্টিকর খাবার কেনা কমিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় সংকুচিত করতে বাধ্য হচ্ছে। মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় এক ধরনের নীরব সংকট তৈরি হয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। সার, ডিজেল, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় কৃষি উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কিন্তু কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। ফলে একদিকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে ভোক্তাও উচ্চমূল্যে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এই দ্বিমুখী চাপ অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট করছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, জ্বালানি তেলের পর এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সূত্র অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, সেচ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে। এর চূড়ান্ত প্রভাব আবারও সাধারণ মানুষের ওপর গিয়ে পড়বে। অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন যথার্থই বলেছেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি মানেই মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেয়া। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষ।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাজার তদারকি কার্যকর করতে হবে। মজুতদারি, সিন্ডিকেট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে কোনো নীতিই কার্যকর হবে না। দ্বিতীয়ত, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে প্রণোদনা বাড়াতে হবে, যাতে সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। তৃতীয়ত, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চতুর্থত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। ন্যায্যমূল্যের পণ্য সরবরাহ, নগদ সহায়তা ও কর্মসংস্থানভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করা। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা মূল্যস্ফীতিকেও প্রভাবিত করছে। তাই আর্থিক খাত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
মূল্যস্ফীতি কেবল অর্থনীতির একটি সূচক নয়; এটি মানুষের জীবনমান, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে যখন সাধারণ মানুষ দিশেহারা, তখন প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক, সাহসী ও সমন্বিত পদক্ষেপ। শুধু আশ্বাস বা পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের কষ্ট লাঘব করা যাবে না। কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি খাতে বাস্তবসম্মত নীতি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার বিস্তার ঘটাতে পারলেই মূল্যস্ফীতির আগুন কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। অন্যথায় এই দীর্ঘস্থায়ী দুষ্টচক্র শুধু অর্থনীতিকেই নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..