• শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৭ অপরাহ্ন

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে র‍্যাংকিং ব্যবস্থা: সুশাসন, স্বচ্ছতা ও মানোন্নয়নের নতুন দিগন্ত

টি এম মাজহার / ১৪৬ দেখেছেন
আপলোড : রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যেই দেশের স্কুল ও কলেজগুলোর মানোন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য র‍্যাংকিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাননীয় শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীর এ ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে।

দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের তদারকি মূলত পরিদর্শননির্ভর কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। এতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শিত হয়েছে, প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে এবং কিছু সুপারিশ উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু এসব তথ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন ও বর্ণনামূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থেকেছে। এগুলোকে সমন্বিত, তুলনামূলক এবং বিশ্লেষণভিত্তিক কাঠামোয় রূপান্তর করা হয়নি। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থান, অগ্রগতি কিংবা ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এই ঘাটতির কারণে শিক্ষক অসন্তোষসহ বিভিন্ন অস্থিতিশীলতার পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছে।

সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় যে নতুন গতি ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা নীতিনির্ধারণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঘোষিত ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি প্রশাসনিক সংস্কার, সুশাসন, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা দেখানো হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা খাতকে ফলাফলভিত্তিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি সমম্বিত র‍্যাংকিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ এবং ঘোষিত ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে অনায়াসে স্থান করে নেবার গুরুত্ব বহণ করে।

প্রচলিত অন্যান্য র‍্যাংকিং পদ্ধতি সাধারণত পরীক্ষার ফলাফল বা সীমিত সূচকের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক চিত্র উঠে আসে না। প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থার বিশেষত্ব হলো- এটি একটি প্রতিষ্ঠানের ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্য’ মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়। এখানে তিনটি মৌলিক ভিত্তি বিবেচনায় নেওয়া হচ: একাডেমিক কার্যক্রম, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা। একাডেমিক কার্যক্রম শিক্ষাদানের মান ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণকে প্রতিফলিত করে। প্রশাসনিক দক্ষতা নির্দেশ করে শৃঙ্খলা, নথিপত্র ব্যবস্থাপনা ও নীতিমালা বাস্তবায়নের সক্ষমতা। আর্থিক শৃঙ্খলা একটি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মান তুলে ধরে। এই তিনটি স্তম্ভের সমন্বিত মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব।

এই র‍্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। প্রতিষ্ঠানের অবস্থান দৃশ্যমান ও তুলনাযোগ্য হলে উন্নয়নের প্রতি আগ্রহ বাড়বে। পাশাপাশি ভালো কাজের স্বীকৃতি নিশ্চিত হবে এবং পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রদান সহজ হবে।

এ ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো – এটি শুধু ধারাবাহিক অবস্থান নির্ধারণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন মানস্তরে শ্রেণিবিন্যাস করতে পারে। যেমন, “উচ্চমান”, “মধ্যম”, “ঝুঁকিপ্রবণ” বা “সংকটাপন্ন” স্তর। এতে র‍্যাংকিং একটি প্রতিযোগিতামূলক তালিকার পাশাপাশি বাস্তবধর্মী মূল্যায়ন কাঠামোতেও পরিণত হয়। ফলে, নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের হাতিয়ার হতে পারে। কোন অঞ্চলে কী সমস্যা, কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। ফলে সম্পদ বণ্টন, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি কার্যক্রম আরও তথ্যভিত্তিক ও কার্যকর হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা- মর্যাদা, বেতন কাঠামো, পদোন্নতি ও কর্মপরিবেশ ইত্যাদি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও যৌক্তিকভাবে মূল্যায়িত হতে পারে। একটি কাঠামোবদ্ধ মূল্যায়ন ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষকদের অবদানও নিরপেক্ষভাবে প্রতিফলিত হবে, যা তাদের আস্থা ও সন্তুষ্টি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। একই সাথে অভিভাবকদের জন্যও এই র‍্যাংকিং ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে পারবেন। এর ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা বাড়বে এবং একটি স্বচ্ছ পরিবেশ তৈরি হবে।

তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। র‍্যাংকিং যেন কেবল সংখ্যার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ না থাকে বা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতি না ঘটায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তথ্যের নির্ভুলতা ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখা অপরিহার্য। পাশাপাশি শহর ও গ্রামাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো – এই ব্যবস্থাকে শাস্তিমূলক বা কৃত্রিম প্রতিযোগিতামূলক নয়, বরং উদ্ভাবনমুখী ও উন্নয়নমুখী হিসেবে প্রয়োগ করা। এটি যেন প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশ যখন একটি দক্ষ, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন শিক্ষা খাতে এমন তথ্যভিত্তিক উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাণগুলোকে একটি সুপরিকল্পিত র‍্যাংকিং ব্যবস্থার অধিনে আনা কেবল মানোন্নয়নই নয়, বরং সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জনআস্থার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

পরিশেষে এটি বলাই যায়, ঘোষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান র‍্যাংকিং দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ের জন্য কোন বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, এটি একটি ধারাবাহিক নীতিগত অগ্রযাত্রার অংশ। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি টেকসই ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..