পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারিয়েছিলেন। অনাথ আশ্রমে বড় হওয়া সেই কিশোর আজ লিখছেন কবিতা—ককবরক ভাষায়। তাঁর সেই লেখার স্বীকৃতিই এলো একটি প্রকাশিত গ্রন্থের আকারে।
বুধবার (৮ এপ্রিল ২০২৬) সকালে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার নয় মাইল এলাকায় হিরন্ময় স্মৃতি পাঠাগার ভবনে তরুণ কবি ডিপ্লো ত্রিপুরার ‘ককবরক ভাষার কবিতা সংকলন’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন হয়। নয় মাইল ত্রিপুরা পাড়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিবারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বিশিষ্টজনরা অংশ নেন। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট।
২০০৬ সালের ৪ জুলাই দীঘিনালায় জন্ম নেওয়া ডিপ্লো ত্রিপুরার জীবন শুরু থেকেই ছিল কঠিন লড়াইয়ের। মায়ের মৃত্যুর পর অনাথ আশ্রমেই কাটে তাঁর শৈশব। তবু থামেননি। প্রাথমিক ও এসএসসি উভয় পরীক্ষায় সাধারণ বৃত্তি অর্জন করেন তিনি। পাশাপাশি জীবনানন্দ দাশ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় মুগ্ধ হয়ে নিজেই তুলে নেন কলম। স্কুলের লাইব্রেরি ও বিভিন্ন বই থেকে ককবরক শব্দ সংগ্রহ করে সমৃদ্ধ করেন নিজের ভাষাভান্ডার।
সমাজ, জাতি ও প্রকৃতির বাস্তবচিত্র তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য। ডিপ্লো বলেন, “কবিতার মাধ্যমে সমাজ ও জাতির জন্য কিছু করতে পারবো কিনা—এই ভাবনা থেকেই লেখা শুরু। ভবিষ্যতে চারুকলায় ভর্তি হয়ে চিত্রশিল্পী হতে চাই।”
প্রকাশিত গ্রন্থে মোট ৩৭টি কবিতা স্থান পেয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কবিতাগুলো ককবরক ভাষার পাশাপাশি বাংলা ও রোমান হরফেও উপস্থাপিত হয়েছে—যা গবেষক, শিক্ষার্থী ও ভাষাপ্রেমী তিন শ্রেণির পাঠকের কাছেই এটিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদকপ্রাপ্ত শিক্ষক চন্দ্র কিশোর ত্রিপুরা। তিনি বলেন, “ডিপ্লোর এই বই শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি আমাদের স্কুল ও এলাকার জন্য গর্বের বিষয়। এমন প্রতিভাকে এগিয়ে নিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।” বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তপু ত্রিপুরা বলেন, “ডিপ্লোকে বুঝতে আমাদের পাঁচ বছর সময় লেগেছে। তার প্রতিভা ও গল্পের পেছনে অনেক সংগ্রাম রয়েছে।” অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কর্মকর্তা সুকেন চাকমা এবং সহকারী শিক্ষক সুতর ত্রিপুরা।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে শিক্ষার্থীদের কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা ও দেশাত্মবোধক গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশিত হয়। বিজয়ী প্রতিযোগীদের মাঝে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বই উপহার দেওয়া হয়।