বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবদান ঐতিহাসিক। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, রপ্তানি, আমদানি এবং প্রবাসী আয় ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিরবচ্ছিন্নভাবে ভূমিকা রেখে চলেছে, তাদের মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক অন্যতম। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া, সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করা এবং সরকারি আর্থিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে অগ্রণী ব্যাংক আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের চাপ এবং ব্যাংকিং খাতের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও অগ্রণী ব্যাংক তার কার্যক্রম সচল রেখেছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভিত্তিক সাময়িক আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণ করলে ব্যাংকটির শক্তি, সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ—সবকিছুরই একটি বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ব্যাংকটির মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ২৯ কোটি টাকার বেশি। এই বিশাল আমানত প্রমাণ করে যে সাধারণ জনগণের আস্থা এখনো অগ্রণী ব্যাংকের প্রতি অটুট রয়েছে। একইসঙ্গে মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ৮০ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা, যা দেশের উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে ব্যাংকটির ব্যাপক সম্পৃক্ততার পরিচয় বহন করে।
বর্তমানে ব্যাংকটির শাখা সংখ্যা ৯৭৯টি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার ৬০০ জন। এ বিশাল নেটওয়ার্ক শুধু একটি ব্যাংকের সাংগঠনিক শক্তিই নয়, বরং দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি বড় অবকাঠামো। গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি ঋণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তাভিত্তিক আর্থিক কার্যক্রমে এই নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই মানবসম্পদকে আরও কার্যকর শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ১ হাজার ১২৯ কোটি টাকার বেশি হওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। এটি প্রমাণ করে যে ব্যবসায়িক সক্ষমতা এখনো বিদ্যমান। তবে একইসঙ্গে উদ্বেগের বিষয় হলো—ব্যাংকটির শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ২৮ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা মামলাকৃত ঋণ হিসেবে আটকে আছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই অর্থ পুনরুদ্ধার করা গেলে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দ্রুত শক্তিশালী হবে।
ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের তুলনায় বর্তমানে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। যদিও এটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবুও ধাপে ধাপে সুশাসন, পুনঃতফসিল ব্যবস্থাপনা, কার্যকর পুনরুদ্ধার কৌশল এবং আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব। একইভাবে মূলধন পর্যাপ্ততার হার (CRAR) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এখনো সন্তোষজনক অবস্থানে না থাকলেও, সঠিক আর্থিক সংস্কার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে তা উন্নয়নযোগ্য।
বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোর পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা। অতীতে রাজনৈতিক ও প্রভাবভিত্তিক ঋণ বিতরণ, দুর্বল মনিটরিং এবং অপর্যাপ্ত ঝুঁকি মূল্যায়নের কারণে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে। প্রতিটি ঋণ যেন উৎপাদনশীল খাতে যায় এবং যথাযথ জামানত ও ঝুঁকি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অনুমোদিত হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সময় এসেছে ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তিনির্ভর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করার। AI-ভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, Early Warning System, ডিজিটাল মনিটরিং এবং ডাটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করা গেলে ভবিষ্যৎ খেলাপি ঋণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল কাস্টমার সার্ভিস এবং স্মার্ট ব্যাংকিং সল্যুশন চালুর মাধ্যমে গ্রাহকসেবার মানও বহুগুণ বাড়ানো যাবে।
অগ্রণী ব্যাংকের সামনে আরেকটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হচ্ছে রেমিট্যান্স, অফশোর ব্যাংকিং এবং বৈদেশিক বাণিজ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য দ্রুত, নিরাপদ এবং কম খরচে রেমিট্যান্স সেবা চালু করা গেলে ব্যাংকটির বৈদেশিক মুদ্রা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি এবং আধুনিক ট্রেড ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্যে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
তবে সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে আমানত। একটি ব্যাংকের প্রকৃত “লাইফ লাইন” হলো তার আমানতভিত্তি। তাই গ্রাহকবান্ধব সেবা, নতুন সঞ্চয় স্কিম, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং প্রবাসীবান্ধব বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারলে অগ্রণী ব্যাংকের পুনরুত্থান শুধু সময়ের ব্যাপার।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো—অগ্রণী ব্যাংকের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য, বিশাল গ্রাহকভিত্তি এবং অভিজ্ঞ মানবসম্পদ। দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে বহু সংকট অতিক্রম করে প্রতিষ্ঠানটি আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান চ্যালেঞ্জও ব্যতিক্রম নয়। প্রয়োজন শুধু সৎ নেতৃত্ব, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত আন্তরিক প্রচেষ্টা।
ঋণ আদায়, আমানত সংগ্রহ, গ্রাহকসেবা এবং শাখাভিত্তিক ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনে যদি সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করেন, তাহলে অগ্রণী ব্যাংক দ্রুতই নতুন শক্তি নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে। কারণ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নতি নয়—বরং দেশের অর্থনীতির ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হওয়া।
অতএব বলা যায়, বিচক্ষণ ঋণনীতি, শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্যে উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং সর্বাত্মক ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম—এই পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে এগোতে পারলে অগ্রণী ব্যাংক আবারও দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থার প্রতীক হিসেবে তার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হবে।একটি শক্তিশালী অগ্রণী ব্যাংক মানেই একটি আরও শক্তিশালী বাংলাদেশ।
লেখকঃ সভাপতি, ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ব্যাব)
Email: aghaazadchowdhury@gmail.com