শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন এক নাম, যিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা নন; বরং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয় পরিচয়, অর্থনৈতিক দর্শন ও আন্তর্জাতিক অবস্থান পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান রূপকার। আগামী ৩০ মে তাঁর ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী। প্রায় অর্ধশতাব্দী পরও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, রাষ্ট্রীয় দর্শন এবং জাতীয়তাবাদ নিয়ে আলোচনায় জিয়াউর রহমানের নাম নতুন করে উচ্চারিত হয়। কারণ তিনি এমন এক সময় বাংলাদেশের নেতৃত্বে আসেন, যখন দেশ অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জাতীয় হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। সেই কঠিন বাস্তবতায় তিনি যে রাজনৈতিক দর্শন সামনে আনেন, তা ছিল বাস্তববাদ, আত্মনির্ভরতা, জাতীয় ঐক্য এবং উৎপাদনমুখী রাষ্ট্রনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর কণ্ঠে স্বাধীনতার বার্তা ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মুক্তিকামী মানুষ নতুন সাহস ও দিকনির্দেশনা পায়। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি “বীর উত্তম” খেতাবে ভূষিত হন। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক অকার্যকারিতা যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তখন ধীরে ধীরে তিনি জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনই যথেষ্ট নয়; একটি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী অর্থনীতি, কার্যকর প্রশাসন, জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের আত্মবিশ্বাস।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”। তিনি মনে করতেন, বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় পরিচয় কেবল ভাষাভিত্তিক হতে পারে না; বরং তা হতে হবে স্বাধীন ভূখণ্ড, সার্বভৌম রাষ্ট্র, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জনগণের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গঠিত একটি সামগ্রিক পরিচয়। এই দর্শনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের জনগণকে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তাঁর মতে, ধর্ম, অঞ্চল বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সবাই প্রথমে বাংলাদেশি। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক বিভাজন ও আদর্শিক সংঘাতের যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সেই সংকট অতিক্রমের একটি রাজনৈতিক কাঠামো প্রদান করে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় যখন জাতীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে, তখন জিয়ার এই দর্শন আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিক সহাবস্থান ও মত প্রকাশের ক্ষেত্র সীমিত হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি রাজনৈতিক দল গঠন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং সংবাদপত্র প্রকাশের সুযোগ পুনরায় উন্মুক্ত করেন। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি একটি মধ্যপন্থী জাতীয় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একত্র হওয়ার সুযোগ পায়। বিএনপির আদর্শিক ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, আত্মনির্ভর অর্থনীতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো বিষয় নয়; বরং জনগণের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং উন্নয়নে সবার সম্পৃক্ততার মধ্যেই গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ নিহিত।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বাস্তবধর্মী দিক ছিল তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তা। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বিদেশি সাহায্যনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছিল। কৃষি উৎপাদন কমে গিয়েছিল, শিল্প খাত দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে তিনি “উৎপাদনের রাজনীতি”র ধারণা সামনে আনেন। তাঁর মতে, রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হবে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং উৎপাদন বৃদ্ধি। তিনি প্রায়ই বলতেন, “দেশকে বাঁচাতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে।”
তাঁর সময় কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। খাল খনন, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, উন্নত বীজ বিতরণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে কৃষি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। তাঁর “খাল কাটা কর্মসূচি” শুধু কৃষি উন্নয়ন নয়; বরং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ পরবর্তীকালে খাদ্য উৎপাদনে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার নীতিগত ভিত্তি অনেকাংশে জিয়ার সময়কার কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, শুধুমাত্র রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনীতি দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেন এবং উদ্যোক্তাভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগকে তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। বর্তমানে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সংস্কৃতি এবং বেসরকারি খাতের যে বিস্তার, তার প্রাথমিক নীতিগত ভিত্তি জিয়ার সময়েই শক্তিশালী হয়।
জিয়াউর রহমান গ্রামীণ উন্নয়নকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলাদেশের প্রাণ গ্রামে এবং গ্রামকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁর সময়ে গ্রামীণ সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ এবং ইউনিয়ন পরিষদকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে তিনি জনগণের অংশগ্রহণমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আজকের বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার কাঠামো এবং গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার যে বিস্তার দেখা যায়, তার ভিত্তি অনেকাংশে জিয়ার সময়কার উন্নয়ন দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমান একটি বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেন। তাঁর সময় বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ফলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই রেমিট্যান্স অর্থনীতির ভিত্তি সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের নীতিগত উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা সামনে আনেন। তাঁর উদ্যোগ ও চিন্তার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা—সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার মতো একটি জটিল ভূরাজনৈতিক অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী পদক্ষেপ।
জিয়াউর রহমান ধর্মকে রাজনৈতিক বিভাজনের উপকরণ হিসেবে নয়; বরং জনগণের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতেন। তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নৈতিকতাকে গুরুত্ব দেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে ধর্মীয় সহনশীলতা ও জাতীয় সংস্কৃতির সমন্বয় ছিল গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে তিনি এমন একটি রাষ্ট্রচিন্তার কথা বলেন, যেখানে আধুনিক উন্নয়ন ও ধর্মীয় মূল্যবোধ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সহাবস্থানের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল সমাজ গঠন সম্ভব।
তরুণ সমাজকে তিনি রাষ্ট্রগঠনের প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর ভাষণে আত্মনির্ভরতা, কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের বিষয়গুলো বারবার উঠে এসেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিদেশি সাহায্যনির্ভর মানসিকতা দিয়ে কোনো জাতি মর্যাদা অর্জন করতে পারে না। তাই তিনি তরুণদের উৎপাদন, কৃষি, শিল্প ও জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। বর্তমান বাংলাদেশের উদ্যোক্তা সংস্কৃতি, কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা এবং আত্মনির্ভর অর্থনীতির যে আলোচনা, তার সঙ্গে জিয়ার চিন্তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
জিয়াউর রহমান জাতীয় ঐক্যের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। তিনি কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন—সব শ্রেণির মানুষকে জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার করার চেষ্টা করেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের শক্তি আসে জনগণের ঐক্য, উৎপাদন এবং আত্মবিশ্বাস থেকে। এই কারণেই তিনি “কাজের রাজনীতি” ও “উৎপাদনের রাজনীতি”র ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
মাত্র কয়েক বছরের রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার ভিত্তি নির্মাণ করেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল আবেগনির্ভর নয়; বরং বাস্তববাদী ও উন্নয়নকেন্দ্রিক। তিনি জনগণকে হতাশা থেকে বের করে আত্মবিশ্বাসী জাতিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন।
আজ তাঁর ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকীতে জাতি যখন তাঁকে স্মরণ করছে, তখন এটি অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমান শুধু একটি নাম নয়; তিনি একটি রাষ্ট্রদর্শন, একটি জাতীয় চেতনা এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গঠনের এক দূরদর্শী রূপকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী পুনর্গঠন, জাতীয় পরিচয়ের বিকাশ, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com