• বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ১২:৪৯ অপরাহ্ন
হেডলাইন :
জুড়ীতে পোষা হাতির মালিকদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত জুড়ীতে পোষা হাতির মালিকদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে রায়পুরায় খাল খননসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের শিগগিরই উদ্বোধন হবে-ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল এমপি সুন্দরবনে জোংড়া খাল এলাকায় বন বিভাগের অভিযান ৪টি নৌকা ও শুটকি তৈরির সরঞ্জাম জব্দ নাসিমা হত্যাকান্ডে গ্রেফতার তান্ত্রিক শামসুল হক ‎বরিশালে MEP গ্রুপের বিভাগীয় বিক্রয় প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত বেনাপোলের ভারতীয় সীমান্তে দুই দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে নারী-শিশুসহ ১২ জনকে পুশ-ইন চেষ্টায় ব্যর্থ-বিএসএফ। সতর্ক অবস্থানে (বিজিবি) চাঁদা না পেয়ে ঘের লুট ও ভাংচুর করলেন স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা

কোরবানির অর্থনীতি ও বাস্তবতার বাংলাদেশ -মো. সহিদুল ইসলাম সুমন

মো. সহিদুল ইসলাম সুমন / ৬৩ দেখেছেন
আপলোড : বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল ও দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। একদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহের উল্লম্ফন, তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধে ইতিবাচক অগ্রগতি এবং কোরবানিকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে; অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট, এটিএম বুথে নগদ অর্থের ঘাটতি, খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং মানুষের ক্রমহ্রাসমান ক্রয়ক্ষমতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে গভীর চাপে ফেলেছে। এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন এবার দৃশ্যমান হয়েছে কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঈদুল আজহা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক চক্র। পশুর হাট, পরিবহন, চামড়াশিল্প, মসলা, খাদ্যপণ্য, কসাই, পোশাক, মোবাইল ব্যাংকিং, ফ্রিজ, খুচরা ব্যবসা—সব মিলিয়ে এই অর্থনীতির আকার প্রায় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি বলে ধারণা করা হয়। ফলে কোরবানির বাজারে স্থবিরতা মানে শুধু পশু বিক্রি কমে যাওয়া নয়; বরং দেশের সামগ্রিক ভোগব্যয়, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও মৌসুমি কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়া।

এবার রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে ঘুরে দেখা যাচ্ছে, পর্যাপ্ত পশু সরবরাহ থাকলেও ক্রেতাদের আগ্রহ আগের তুলনায় কম। বিশেষ করে বড় গরুর বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। যারা আগে এককভাবে বড় গরু কোরবানি দিতেন, তাদের অনেকেই এবার ভাগে কোরবানি দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় একটি অংশ ছোট গরু, ছাগল কিংবা ভেড়ার দিকে ঝুঁকছে। কেউ কেউ আবার পুরোপুরি কোরবানি থেকে সরে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।

এটি নিছক ভোক্তা আচরণের পরিবর্তন নয়; বরং মানুষের আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার সরাসরি প্রতিফলন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের আশপাশে অবস্থান করছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপও এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস—প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে পরিবারের মাসিক আয়ের বড় অংশ এখন খাদ্য ও জরুরি ব্যয়েই শেষ হয়ে যাচ্ছে। উৎসবকেন্দ্রিক ব্যয়ের জায়গা দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আয় কিছুটা বাড়লেও বাজারদরের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নেই। ফলে উৎসবকেন্দ্রিক ভোগব্যয় কমে যাওয়া এখন অর্থনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে খামারিরাও এবার চরম চাপে রয়েছেন। পশুখাদ্য, ভুসি, খৈল, ভুট্টা, ওষুধ, শ্রমিক ব্যয় এবং পরিবহন খরচ—সবকিছুর দাম বেড়েছে। অনেক খামারি অভিযোগ করছেন, গত বছরের তুলনায় ট্রাক ভাড়া ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে গরু লালন-পালনে বিনিয়োগ বাড়লেও বাজারে সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ পশু। সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ। অর্থাৎ প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বাস্তবে যদি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যায়, তবে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এর সরাসরি আঘাত পড়বে ক্ষুদ্র খামারিদের ওপর।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখন কোরবানিকেন্দ্রিক পশু পালনের সঙ্গে জড়িত। হাজার হাজার পরিবার সারা বছর একটি বা দুটি গরু লালন-পালন করে শুধু ঈদের বাজারের আশায়। এই আয় দিয়ে তারা ঋণ শোধ করেন, কৃষি উৎপাদনে বিনিয়োগ করেন, সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালান। ফলে কোরবানির বাজার দুর্বল হলে তার প্রভাব পড়ে গ্রামের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

তবে এই সংকটের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। সবচেয়ে বড় আশার জায়গা হলো রেমিট্যান্স প্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মে মাসের প্রথম ২৩ দিনেই দেশে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৪১ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি। ঈদকে সামনে রেখে প্রবাসীরা বাড়তি অর্থ পাঠানোয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ টাকার প্রবাহ বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় স্থিতিশীলতার জায়গা হয়ে উঠেছে এই রেমিট্যান্স। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ থাকলেও প্রবাসী আয় এখনো অর্থনীতিকে সচল রাখছে। গ্রামের বাজার, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা এবং স্থানীয় সেবাখাতে এর ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

একইভাবে তৈরি পোশাক খাত থেকেও ইতিবাচক বার্তা এসেছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৯ শতাংশের বেশি কারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে। প্রায় ৯৫ শতাংশ কারখানা মে মাসের অগ্রিম বেতনও দিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, রফতানি আদেশে অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক ঋণ সংকটের মধ্যেও এই অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ দেশের প্রায় ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিকের হাতে ঈদের আগে নগদ অর্থ পৌঁছানো মানে বাজারে কিছুটা হলেও ভোগব্যয় সচল থাকা। অন্যথায় শহুরে অর্থনীতিতে চাপ আরও বেড়ে যেত।

কিন্তু অর্থনীতির আরেকটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে ব্যাংকিং খাতে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এটিএম বুথে টাকা না থাকা, সীমিত উত্তোলন কিংবা অন্য ব্যাংকের কার্ডে লেনদেন সীমিত করার ঘটনা সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এটি কেবল সাময়িক নগদ সংকট নয়; বরং দেশের ব্যাংকিং খাতের গভীর দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।

দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং দুর্বল তদারকির কারণে দেশের বহু ব্যাংক আর্থিকভাবে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। খেলাপি ঋণের সরকারি হিসাবই এখন কয়েক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। ফলে ঈদের মতো অতিরিক্ত নগদ চাহিদার সময় ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে নতুন গভর্নরের স্বাক্ষরযুক্ত নোট এটিএম মেশিনে শনাক্তকরণ সমস্যাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি ও ব্যাংকিং অবকাঠামো এখনো কতটা দুর্বল।

অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলিত খাত হচ্ছে চামড়াশিল্প। কোরবানির সময় দেশের সারা বছরের বড় অংশের কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়। অথচ এই খাত এখনো সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। একসময় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে বাংলাদেশের রফতানি আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল। বর্তমানে তা ৮০০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

এর পেছনে রয়েছে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা, সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং ব্যাংক ঋণ সংকট। এবারও চামড়া খাতে নতুন ঋণ বিতরণ খুব সীমিত। খেলাপি ঋণের কারণে অনেক উদ্যোক্তা কাঁচা চামড়া কিনতে প্রয়োজনীয় অর্থ পাচ্ছেন না। এতে ঈদের পর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

অন্যদিকে শপিংমলগুলোতেও এবার প্রত্যাশিত ভিড় দেখা যাচ্ছে না। বড় বড় ব্র্যান্ড ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিলেও ক্রেতা কম। কারণ মানুষ এখন প্রয়োজনীয় ব্যয় ছাড়া অন্য খাতে খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি ভোক্তা আস্থার দুর্বলতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
আসলে অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় মানুষের আচরণে। মানুষ যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত থাকে, তখন তারা খরচ কমিয়ে সঞ্চয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশে ঠিক সেই প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি এখন সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। কারণ তাদের আয় স্থির থাকলেও ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। ফলে জীবনযাত্রার মান ধরে রাখাই কঠিন হয়ে উঠছে।
তবু বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তি পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি। কৃষি, প্রবাসী আয়, তৈরি পোশাক শিল্প এবং অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় এখনো অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—গ্রামীণ অর্থনীতি এখনও প্রাণবন্ত। শহরের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও কোরবানিকে কেন্দ্র করে গ্রামে যে নগদ অর্থের প্রবাহ তৈরি হয়, সেটি লাখ লাখ মানুষের জীবিকাকে সচল রাখে।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধু মৌসুমি অর্থনৈতিক প্রবাহ দিয়ে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন ব্যাংক খাতে সুশাসন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, কৃষি ও শিল্পে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোরতা এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অর্থনীতির বড় সূচক কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়; মানুষের স্বস্তি। মানুষ যদি ঈদের মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎসবেও স্বাভাবিকভাবে খরচ করতে না পারে, তবে বুঝতে হবে অর্থনীতির ভেতরে গভীর চাপ জমে আছে।
কোরবানির ঈদ তাই এবার শুধু ধর্মীয় উৎসবের উপলক্ষ নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির বাস্তব চিত্র দেখারও একটি বড় আয়না। এই আয়নায় যেমন সংকটের ছাপ স্পষ্ট, তেমনি সম্ভাবনার কিছু আলোও এখনো জ্বলছে। সেই আলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখন প্রয়োজন কার্যকর অর্থনৈতিক সংস্কার, সুশাসন, আস্থার পরিবেশ এবং বাস্তবমুখী নীতি। অন্যথায় সাময়িক স্বস্তির আড়ালে জমে থাকা অর্থনৈতিক চাপ ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..