• মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০২:১৫ অপরাহ্ন

আলপালন বা অম্বুবাচি: দীর্ঘতম দিনে ধরিত্রীর ঋতুকাল, মানুষের সংযমী উৎসব

পপেন ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি: / ৪৫ দেখেছেন
আপলোড : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

এই উপমহাদেশের ত্রিপুরা রাজাগণের স্বাধীন আমল হতে প্রাচীন পাহাড়িদের ঘরে ঘরে আলপালন উৎসব পালিত হয়। চলতি ১৪৩৬ ত্রিপুরাব্দের ৩১ তালক্রান, ১৪৩৩ বাংলার আষাঢ় মাসের ৭ তারিখ, ইংরেজি দিনক্ষণ হিসেবে ২১ জুনে। প্রতিবছর এই দিনে (আষাঢ় ৭) পালন করা হয় উৎসবটি। শতাব্দীর পর শতাব্দীকাল ধরে উৎসব উদযাপনে ব্যতিক্রম ছিল না। বর্তমানেও নয়। বরং নতুন সমারোহ আর আনন্দ উদযাপনের ভেতর দিয়ে ত্রিপুরা ও চাকমা জনগোষ্ঠীর মানুষ পালন করছে এই উৎসব।

কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, পাহাড়ে যে উৎসব “আলপালন” নামে পরিচিত, কামরূপ-কামাখ্যা থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, বিহার ও বাংলাদেশের সমতল জনপদ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এটিই পরিচিত “অম্বুবাচি” নামে। নাম ভিন্ন, ভাষা ভিন্ন, কিন্তু বিশ্বাসের মূল সুর একই — আষাঢ়ের এই নির্দিষ্ট সময়ে ধরিত্রী মা ঋতুময়ী হন, আর তাই তাঁকে এই কটা দিন বিশ্রাম দিতে হয়। দুটি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর দুটি ভিন্ন নামের উৎসব আদতে একই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একই লোকপ্রজ্ঞার দুই রূপ।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় এবং শহুরে ব্যস্ততায় এই উৎসব পালনের সমারোহ নিয়ে খুব যে বেশি মানুষ জানে, তা নয়। বর্তমান জামানায় শহুরে কর্মময় জীবন আর আকাশসংস্কৃতির প্রভাবে অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা এই উৎসব সম্পর্কে জানেন না, কেন এই উৎসব পালন করা হয়। অথবা উৎসব সম্পর্কে জানলেও কাজের ব্যস্ততায় ভুলেই যান আর পালন করার সুযোগও হয় না। শুধু তাই নয়, শহুরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্মদের কাছেও এই উৎসব একেবারে নতুন। অবশ্য এর কারণ হলো, অন্য প্রভাবশালী সম্প্রদায়ের কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সময়ের বিবর্তনে প্রায়ই তাঁদের অতীত ঐতিহ্য ভুলে গেছে। অথবা সমাজের চারপাশে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের চলতি উৎসবগুলো এতটাই জমজমাট হয় যে, এ রকম প্রকৃতিবান্ধব উৎসবগুলো সবার অগোচরে হারিয়ে যায়।

আলপালন কী?:
আলপালন উৎসব উদযাপন অনেকটা বৈসু (বিজু, বিহু, বিষু, চৈত্র-সংক্রান্তি ইত্যাদি) উদযাপনের মতো। পার্থক্য কেবল বৈসু উদযাপন হয় তিন দিন এবং বহু জনগোষ্ঠী এ উৎসব উদযাপন করে থাকে। কিন্তু আলপালন উৎসব হয় সাধারণত একদিন আর পালন করে প্রধানত ত্রিপুরা ও চাকমাসহ কয়েকটি জনগোষ্ঠীর মানুষ।
‘আলপালন’—আল মানে হাল চাষ আর পালন মানে এখানে বন্ধ বা নিষিদ্ধ করা বোঝায়। তাই এ দিনে হাল চাষ করা থেকে বিরত থাকে জুমিয়া কৃষকরা। শুধু হাল চাষ নয়, দা, কোদাল, শাবলসহ যেকোনো কিছু দিয়ে মাটি আঘাত করা, গাছপালা কাটা, লতাপাতা ছেঁড়া, ফলমূল ছেঁড়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা হয়। এদিন প্রত্যেক ত্রিপুরা-চাকমার ঘরে ঘরে হাঁস, মুরগি, শূকর কাটা হয়। না পারলেও একটা মুরগি কাটা হবে। প্রকৃতিপূজারি জনগোষ্ঠীরা পৃথিবীকে ‘মাতা’ বা ‘নারী’ হিসেবে জানেন।
তাঁদের বিশ্বাস, প্রতিবছর আষাঢ় মাসের ৭ তারিখে বসুন্ধরা মায়ের ঋতুস্বাব হয়। যা মানুষ নারীর প্রতি মাসে হয়ে থাকে। ঋতুস্রাবে মায়ের শরীর অশুচি হয়, তাই ঘরে ঘরে হাঁস-মুরগি কেটে শুচি করা হয়। এবং পৃথিবী মাতার ঋতুস্রাবের এই দিনে তাঁকে আঘাত করলে ভীষণ কষ্ট পাবে জেনেই তাঁরা মাটির ওপর আঘাত করা থেকে বিরত থাকেন। আর পৃথিবী যদি কষ্ট পায়, তাহলে সে পরবর্তীকালে মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে বলেও তাঁদের বিশ্বাস।
প্রাকৃতিক দুর্যোগকে আদিম জনগোষ্ঠী পৃথিবীর ওপর মানুষের নিয়মিত আঘাতের প্রতিশোধ হিসেবে ধরে নেয়। ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, তুফান, সুনামি—এসবই প্রকৃতির প্রতিশোধমূলক আচরণ বলে তাঁদের বিশ্বাস। তাই সনাতন ধর্মাবলম্বী ও প্রকৃতির পূজারি ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীরা বড় বড় গাছ, ছড়ানদী, বড় পাথর, বন-পাহাড়, গ্রহ-নক্ষত্রকে দেবতার আসনে বসিয়ে পূজা করে থাকে। এই উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি জুমিয়া কৃষক পরিবার কাজে একদিন বিশ্রামও গ্রহণ করে থাকে।
কেবল আনুষ্ঠানিক উৎসব উদযাপন নয়, জুম চাষের জঙ্গল কাটার আগেও ত্রিপুরা জুমিয়ারা বন বা পাহাড় দেবতার কাছে অনুমতি নিয়ে থাকেন। যদি স্বপ্নে বনদেবতা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে থাকে, তাহলে ওই বছর সে আর ওই পাহাড়টিতে জুম চাষ করবে না। অন্যত্র গিয়ে পাহাড় দেখবে একই নিয়মে। যদি কোনোটাই অনুমতি না পায়, তাহলে সে সেই বছর জুম চাষই করবে না তাঁরা।

উৎপত্তিস্থল: কামাখ্যা-কামরূপের তান্ত্রিক ঐতিহ্য
পাহাড়ের আলপালনের পাশাপাশি এই একই উৎসবের সবচেয়ে বিখ্যাত ও বৃহৎ পরিসরের রূপটি দেখা যায় আসামের প্রাচীন কামরূপ রাজ্যে, বর্তমান গুয়াহাটির নীলাচল পাহাড়ের কামাখ্যা মন্দিরে। শাক্ত ধর্মের অন্যতম প্রধান পীঠস্থান এই মন্দির তন্ত্রসাধনার এক বিশেষ কেন্দ্র হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্বীকৃত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, আষাঢ় মাসের নির্দিষ্ট সময়ে দেবী কামাখ্যা ঋতুমতী হন, আর তাঁর সঙ্গে ঋতুময়ী হন স্বয়ং ধরিত্রী মা। এই তিন-চার দিন মন্দিরের দ্বার বন্ধ থাকে, পূজার্চনা স্থগিত থাকে, পুরোহিতরা উপবাস পালন করেন।
এই বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি রহস্যময় ও বহুল প্রচলিত জনশ্রুতি — অম্বুবাচির এই তিন-চার দিন মন্দির-সংলগ্ন জলধারা ও কাছের ব্রহ্মপুত্র নদের জল রক্তের মতো লাল হয়ে ওঠে। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী কামাখ্যার ঋতুস্রাবের কারণেই এই রক্তবর্ণ ধারণ করে নদীর জল, আর এই দৃশ্যকেই দেবীর ঋতুমতী হওয়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ বলে মনে করা হয়। মন্দিরের গর্ভগৃহে যে প্রাকৃতিক প্রস্রবণ আছে, অম্বুবাচির সময় তার জলও লাল হয়ে যায় বলে তীর্থযাত্রীরা সাক্ষ্য দেন।
এই ঘটনার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও প্রচলিত আছে — মন্দির কর্তৃপক্ষ ও কিছু গবেষকের মতে, এই রক্তবর্ণের পেছনে কাজ করে আয়রন অক্সাইডের প্রভাব, অর্থাৎ ভূগর্ভস্থ শিলাস্তর থেকে নির্গত লৌহঘটিত যৌগ পানির সংস্পর্শে এসে লালচে রঙ ধারণ করে। কারও কারও মতে, এই সময় পুরোহিতরা প্রতীকীভাবে সিঁদুর বা অন্য লাল উপকরণ মিশিয়েও জলধারাকে রক্তবর্ণ করে তোলেন, যা ভক্তদের কাছে দেবীর ঋতুকালের প্রতীকী উপস্থাপনা হিসেবে গণ্য হয়। বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের এই দ্বৈত ব্যাখ্যাই কামাখ্যা-অম্বুবাচিকে ঘিরে গড়ে তুলেছে এক রহস্যময় ও বিস্ময়কর জনপ্রিয়তা, যা প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষাধিক তীর্থযাত্রী ও তান্ত্রিক সাধককে টেনে আনে নীলাচল পাহাড়ে।
কামরূপ থেকে এই বিশ্বাস ও আচার ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিতে। নিম্ন আসামে একে বলা হয় “আমতি” বা “অমতী”, আবার উজানি আসামে এর পরিচিতি “ষাঁঠ” নামে। বাংলাদেশের গ্রামবাংলায়ও আষাঢ়ের সাত থেকে এগারো তারিখ পর্যন্ত নারীরা পালন করেন এই আচার — যেখানে চাষাবাদ, হালচাষ, গৃহপ্রবেশ, বিবাহের মতো সকল মাঙ্গলিক কাজ বন্ধ থাকে। আর পার্বত্য চট্টগ্রামে এরই নাম “আলপালন”।

২১ জুন: যেখানে লুকিয়ে আছে আলপালন-অম্বুবাচির প্রকৃত হিসাব-নিকাশ:
আলপালন বা অম্বুবাচির তারিখ নির্ধারণ নিছক কাল্পনিক বা স্বেচ্ছাচারী নয় — এর পেছনে কাজ করে একটি সুনির্দিষ্ট সৌর-জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বিন্দু। পৃথিবী যেহেতু নিজের অক্ষে কিছুটা হেলে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, তাই বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে উত্তর গোলার্ধ সূর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি চলে আসে। ২১ জুন সেই দিন, যেদিন সূর্য কর্কটক্রান্তি রেখায় খাড়াভাবে কিরণ দেয়, ফলে উত্তর গোলার্ধে দিন হয় বছরের সবচেয়ে বড় আর রাত সবচেয়ে ছোট। এই দিনটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় সামার সলস্টিস বা কর্কটক্রান্তি দিবস, লোকমুখে অয়ন দিবসও বলা হয়।
ঠিক এই দিন থেকেই সূর্যের আপাত গতিপথ দিক পরিবর্তন করে — উত্তরায়ণ শেষ হয়ে শুরু হয় দক্ষিণায়ণ, অর্থাৎ সূর্য উত্তরায়নের শেষ সীমা অতিক্রম করে দক্ষিণমুখী যাত্রা শুরু করে। হিন্দু সৌর-নিরয়ণ পঞ্জিকায় অম্বুবাচির গণনা করা হয় ঠিক এই দক্ষিণায়ণ-বিন্দু থেকেই — সূর্যের দক্ষিণায়নের দিন থেকে তিন দিন, অর্থাৎ আষাঢ়ের ৭ তারিখ থেকে দশ দিনের মধ্যে এই পার্বণের পালনকাল নির্ধারিত হয়। ত্রিপুরাব্দ পঞ্জিকার হিসাবেও আলপালন পালিত হয় একই দিনে — ১৪৩৬ ত্রিপুরাব্দের ৩১ তালক্রান, ১৪৩৩ বাংলা আষাঢ় ৭, ইংরেজি ২১ জুন। অর্থাৎ তিনটি ভিন্ন পঞ্জিকা-ব্যবস্থা (সৌর-নিরয়ণ, বাংলা ও ত্রিপুরাব্দ) একই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে।
অর্থাৎ যে দিনটি বিজ্ঞানের চোখে পৃথিবীর সৌরপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক-বিন্দু (turning point) — সেই একই দিনকে লোকবিশ্বাসের ভাষায় কল্পনা করা হয়েছে ধরিত্রীর “ঋতুকাল” শুরুর মুহূর্ত হিসেবে। দুটি ভিন্ন জ্ঞানকাঠামো — একটি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, অন্যটি প্রাচীন লোকবিশ্বাস — একই প্রাকৃতিক ঘটনাকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করছে, কিন্তু উভয়েরই উৎসমূল একটিই: পৃথিবীর সূর্যকেন্দ্রিক কক্ষপথের নির্দিষ্ট জ্যামিতিক অবস্থান।

তাইয়ুং-তকচিং বা ধনেশ পাখির মুক্তি: প্রকৃতির আরেকটি জৈবিক সংকেত:
আলপালনের সঙ্গে দুই ধরনের বিশালাকার পাখিরও সম্পৃক্ত রয়েছে। আষাঢ় মাসের ৭ তারিখের দিনে অথবা বেশ কিছুদিন আগে থেকে ঝড়-বৃষ্টি অবশ্যই হবে। আর এ সময় তাইয়ুং ও তকচিং (ধনেশ) পাখির বাচ্চা গর্ত থেকে মুক্ত হয়। মাটির গর্ত বলে বৃষ্টির পানিতে না ভিজলে পাখির বাচ্চাগুলো গর্ত থেকে বেরোতে পারত না। তাই আলপালনের সঙ্গে এ তাইয়ুং-তকচিং পাখিরও একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ধনেশ পাখির গর্ত যতক্ষণ না পর্যন্ত বৃষ্টির পানিতে ভিজে নরম হয়ে বাচ্চামুক্ত না হবে, ততক্ষণ বৃষ্টি হতে হবে। ককবরকে (ত্রিপুরা ভাষায়) তাইয়ুং ও তকচিং নামে দুটো প্রজাতি বিশালাকার পাখি রয়েছে, যা আজ থেকে ৩০-৩৫ বছর আগেও তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ের আনাচে-কানাচে দেখা মিলত। এ দুই প্রজাতি পাখির নাম ত্রিপুরা লোককাহিনীতেও শোনা যায়। তাইয়ুং আকারে তকচিংয়ের চেয়ে বিশালাকার। অতীতে এই দিনে গর্ত থেকে মুক্ত হওয়ার পর তাইয়ুং পাখি ঝাঁক বেঁধে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেত। বাড়ির ভেতরে থাকলেও তাইয়ুং ওড়ার শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যেত। ঠিক এই দিনে ত্রিপুরারা উড়ন্ত তাইয়ুং পাখির ঝাঁক দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত। এখন এ কথাগুলো কেবলই গল্প।
এই লোককথার পেছনে কিন্তু লুকিয়ে আছে বাস্তব ও বিস্ময়কর পক্ষীবিজ্ঞান। ধনেশ পাখির প্রজনন-রীতি পাখিকুলের মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত আচরণগুলোর একটি। স্ত্রী ধনেশ গাছের কোটরে ডিম পাড়ার পর মাটি, নিজের বিষ্ঠা ও গাছের আঠা মিশিয়ে কোটরের মুখ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, কেবল একটি সরু ফাঁক রেখে দেয়, যার মধ্য দিয়ে পুরুষ পাখি বাইরে থেকে খাবার সরবরাহ করে। এই বন্দিদশায় স্ত্রী পাখি ডিমে তা দেয়, বাচ্চা ফোটার পরও বেশ কিছুদিন বাচ্চাদের সঙ্গে আবদ্ধ থেকে যায় — এমনকি এই সময়ে তার পুরনো পালক ঝরে গিয়ে নতুন পালক গজায় বলে সাময়িকভাবে উড়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে সে। ফলে শিকারি প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে এই মাটি-বন্দিদশা তার ও তার বাচ্চাদের জন্য এক প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। বাচ্চারা যথেষ্ট বড় ও শক্তিশালী হয়ে উঠলে মা পাখি ভেতর থেকে মাটির দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসে। এই “মুক্তি”র সময়টা প্রায়শই মিলে যায় বর্ষা মৌসুমের সূচনাকালের সঙ্গে — কারণ মূলত ফলভুক এই পাখির প্রজনন-চক্র এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যাতে বাচ্চা ফোটা ও মুক্ত হওয়ার সময়টা মেলে বর্ষাকালীন ফল-প্রাচুর্যের মৌসুমের সঙ্গে। আর বৃষ্টির আর্দ্রতা যে শুকিয়ে যাওয়া মাটির দেয়ালকে নরম ও ভঙ্গুর করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে, সেই পর্যবেক্ষণও জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একেবারে অযৌক্তিক নয়।
দুঃখজনকভাবে, আশি-নব্বই দশকের দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিস্থিতির সময় গভীর বন-পাহাড়ের বিশাল বিশাল শতবর্ষী গাছপালা নিরাপত্তার অজুহাতে সেনাবাহিনীরা কেটে উজাড় করে দেয়। ফলে এখানকার বড় গাছপালা ধ্বংস হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে এ পাখি প্রজাতির আবাসস্থলও ধ্বংস হয়ে যায়। জুম চাষের ভূমি বেদখল করে রাষ্ট্র বন বিভাগকে দিয়ে সংরক্ষিত বন নির্ধারণের নামে সেখানে সেগুন বাগান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডকে দিয়ে রাবার বাগান গড়ে তোলা হয় ব্যাপক হারে। এতে করে জুম চাষের পাহাড় হারিয়ে ভূমিহীন হয়ে পড়ে পাহাড়িরা, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক বনে গড়ে ওঠে সামাজিক-বাণিজ্যিক বনায়ন। বনায়নের ফলে প্রাকৃতিক বন ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয়েছে অনেক দেশি-পরিচিত পশু-পাখির প্রজাতি। হারিয়েছে জীববৈচিত্র্যও — আর তার সঙ্গেই হারিয়ে যাচ্ছে তাইয়ুং পাখির ঝাঁক দেখার সেই উন্মুখ অপেক্ষার স্মৃতিও।
অর্থাৎ এখানেও দেখা যায় একই প্যাটার্ন — সূর্যের অয়ন-পরিবর্তনের মতোই তাইয়ুং-তকচিং পাখির এই জৈবিক চক্রকেও প্রাচীন লোকসমাজ পর্যবেক্ষণ করে নিজস্ব ঋতু-পঞ্জিকার অংশ করে নিয়েছিল। বন্যপ্রাণীর আচরণকে ঋতু পরিবর্তনের সংকেত হিসেবে পাঠ করার এই পদ্ধতিকে আধুনিক বিজ্ঞানে বলা হয় “ফেনোলজি” (phenology) — অর্থাৎ জীবজগতের পর্যাবৃত্তিক ঘটনাবলি দিয়ে ঋতু নির্ণয়ের বিজ্ঞান। সূর্যের সলস্টিস এবং ধনেশ পাখির মুক্তি — জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও জৈবিক, দুই ভিন্ন স্তরের প্রাকৃতিক ঘটনাই আলপালন-অম্বুবাচির লোকপঞ্জিকায় একসূত্রে গাঁথা হয়ে গেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আলপালন উদযাপন: পানাহার আর প্রকৃতির প্রতি নীরব শ্রদ্ধা:
ত্রিপুরাদের কোনো পার্বণ মানেই আনন্দের উৎসব। আর উৎসবে চলে চক-গালা আর পিঠা-পায়েস ও মাংস ভোজন উৎসব। চলে নানা রকমের চক-গালার পান। সাধারণত উৎসব-পার্বণেই নানা ধরনের চক-গালা তৈরি করে থাকে পাহাড়ি নারীরা, যা অন্যান্য দিনে হয় না। কয়েক প্রকার চক বা চুয়াকের (মদ) মধ্যে রয়েছে চক, গালা, ব্রান্টি, বতক উৎসব। আলপালন উৎসবে ঘরে ঘরে মদ পান আর মাংস ভোজন করে বেড়ায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ। আনন্দ করে শিশু-কিশোররাও। সাম্প্রতিক সময়ে এই উপলক্ষ্যে পিঠা-পায়েস তৈরির রেওয়াজও বেড়েছে, যা দেখায় উৎসবটি এখনও জীবন্ত ও বিবর্তনশীল।
তবে আনন্দ-উৎসবের এই দিনেও পাহাড়ি সমাজ মেনে চলে এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা — আগেই বলা হয়েছে, এই দিনে মাটিতে কোপ বা আঘাত করা যায় না, কোনো গাছের পাতা ছেঁড়া বা ডাল কাটা যায় না, মাটি খোঁড়া, চাষাবাদ, কাঠ কাটা বা গাছপালার কোনো ক্ষতিসাধন থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা হয়। সারাদিন কোনো কায়িক শ্রম বা প্রকৃতিকে স্পর্শ করার মতো কাজ না করে শুধু আনন্দ-ফূর্তি করেই দিনটি পার করে দেওয়া হয়।
এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আলপালনের মূল দর্শনের একটি প্রতিফলন, যা কামাখ্যা-কেন্দ্রিক বিশ্বাসের সঙ্গেও এক সুতোয় গাঁথা। কামাখ্যায় যেমন মন্দিরের দ্বার বন্ধ রেখে দেবীকে স্পর্শ-পূজা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও তেমনি মাটি ও গাছপালাকে এই একটি দিনের জন্য সম্পূর্ণ স্পর্শমুক্ত রেখে এক ধরনের প্রতীকী বিশ্রাম দেয় প্রকৃতিকে। ভৌগোলিকভাবে বহু দূরে অবস্থান করেও, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে নিছক লোকাচার ও জীবনদর্শনের স্তরে কামরূপ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের এই মিল সত্যিই লক্ষণীয়।

লোকজ্ঞানের ভেতরের যুক্তি: মাটির বিশ্রাম, প্রকৃতির ছন্দ:
আধুনিক দৃষ্টিতে আলপালন-অম্বুবাচিকে নিছক কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু এই আচারের পেছনের যুক্তিকাঠামো লক্ষ করলে দেখা যায়, এটি আদতে একধরনের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ-পঞ্জিকা — যা সলস্টিস-পরবর্তী মৌসুমি বায়ুর আগমনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সূর্যের দক্ষিণায়ণ শুরুর ঠিক মুখে মাটিকে “বিশ্রাম” দেওয়ার এই রীতি, প্রকৃতপক্ষে কৃষিকাজে সাময়িক বিরতি দিয়ে মাটিকে আর্দ্র হওয়ার, বীজবপনের উপযোগী হয়ে ওঠার সময় দেওয়ার একটি প্রতীকী ব্যবস্থাপনা বলেও ব্যাখ্যা করা যায়।
আদিবাসী ও লোকজ সমাজে প্রকৃতিকে নিছক সম্পদ নয়, বরং জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখার যে দর্শন প্রচলিত — পাহাড়, নদী, বন, মাটি সবকিছুর সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করার যে চর্চা চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আজও জীবন্ত — আলপালন-অম্বুবাচির ধরিত্রী-চেতনা তারই একটি প্রকাশ। ত্রিপুরা, মারমা, চাকমা, সাঁওতাল প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর ঋতুভিত্তিক উৎসব, কৃষি-আচার ও বনজ সম্পদ ব্যবহারের নিয়মকানুনেও একই ধরনের প্রকৃতি-সংলগ্ন জীবনদর্শনের ছাপ স্পষ্ট — যেখানে সৌরবর্ষের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক-বিন্দুগুলো (যেমন অয়নকাল) নানা রূপে সামাজিক-কৃষি জীবনে স্বীকৃতি পেয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন পাঠ:
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে যখন বৃষ্টিপাতের ধরন অনিয়মিত হয়ে পড়ছে, মৌসুমি বায়ুর সময়সূচি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, তখন আলপালন-অম্বুবাচির মতো সলস্টিস-নির্ভর লোকাচারগুলো গবেষকদের কাছে এক নতুন তাৎপর্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। এই উৎসবগুলো শত শত বছর ধরে সংরক্ষিত একপ্রকার “জলবায়ু স্মৃতি” — যা নির্দিষ্ট অঞ্চলে সূর্যের অয়ন-পরিবর্তন, বর্ষার প্রত্যাশিত আগমনকাল, কৃষিচক্র এবং প্রাকৃতিক ছন্দের একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে কাজ করতে পারে।
এখানে স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন: আলপালন বা অম্বুবাচি নিজে জলবায়ু পরিবর্তন রোধের কোনো বৈজ্ঞানিক বা নীতিগত হাতিয়ার নয়। এটি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো, কার্বন শোষণ বা বনায়নের মতো কোনো প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নয়। তবে জলবায়ু-অভিযোজন (climate adaptation) আলোচনায় বিশ্বজুড়ে যে “ঐতিহ্যবাহী পরিবেশগত জ্ঞান” (Traditional Ecological Knowledge বা TEK) নিয়ে ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তার একটি জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে এই লোকাচারগুলোকে বিবেচনা করা যায়। জাতিসংঘের জলবায়ু সংক্রান্ত বিভিন্ন ফোরামেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রজন্মান্তরে সঞ্চিত প্রকৃতি-জ্ঞানকে অভিযোজন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আলোচনা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।

সংযোগ যেখানে, সীমাবদ্ধতা যেখানে:
আলপালন-অম্বুবাচি ও জলবায়ু আলোচনার মধ্যে সংযোগসূত্র মূলত তিনটি জায়গায়। প্রথমত, এটি একটি জীবন্ত উদাহরণ যে কীভাবে প্রাক-আধুনিক সমাজ সূর্যের অয়নকাল ও ঋতুচক্র পর্যবেক্ষণ করে নিজস্ব সামাজিক-কৃষি ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিল — ২১ জুনের সলস্টিসকে কেন্দ্র করে এর গণনা তারই প্রমাণ। দ্বিতীয়ত, প্রকৃতিকে সম্মান ও বিশ্রাম দেওয়ার যে দর্শন এই আচারে নিহিত, তা টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনার আধুনিক ধারণার সঙ্গে দার্শনিকভাবে সাযুজ্যপূর্ণ। তৃতীয়ত, আদিবাসী ও লোকজ সমাজের এই ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো সংরক্ষণ করার অর্থ হলো এমন এক জ্ঞানভাণ্ডার সংরক্ষণ করা, যা ভবিষ্যতে জলবায়ু-অভিযোজন গবেষণায় কাজে লাগতে পারে।
তবে এই সংযোগকে অতিরিক্ত প্রসারিত করাও সমীচীন নয়। আলপালন-অম্বুবাচি একটি ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত আচার, বৈজ্ঞানিক জলবায়ু তত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি — যদিও এর তারিখ-গণনা একটি প্রকৃত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার (সলস্টিস) সঙ্গে যুক্ত। একে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধের “সমাধান” হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর হবে।

উপসংহার: ঐতিহ্য ও বিজ্ঞানের সেতুবন্ধন
কামরূপ-কামাখ্যার মাটি থেকে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা অম্বুবাচি-আলপালন আজ শুধু একটি ধর্মীয় বা লোকজ উৎসব নয় — এটি প্রকৃতির প্রতি মানুষের আদিম শ্রদ্ধাবোধের একটি জীবন্ত নিদর্শন, যার শিকড় প্রোথিত আছে সূর্যের আবর্তনের একটি বাস্তব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মুহূর্তে — ২১ জুনের দীর্ঘতম দিনে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ যখন বিশ্বজুড়ে নতুন করে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার দাবি তুলছে, তখন এই লোকাচার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির ছন্দ মেনে চলার, তাকে বিশ্রাম দেওয়ার এবং তার সঙ্গে সহাবস্থানের চেতনা মানব সমাজের মধ্যে চিরকালই কোনো না কোনো রূপে বিদ্যমান ছিল — আর সেই চেতনা প্রায়শই নির্দিষ্ট সৌর-জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার সঙ্গে নিখুঁতভাবে সংযুক্ত।
কিন্তু এই ঐতিহ্য আজ বিপন্ন। আশি-নব্বই দশকের সংঘাত-উত্তর বন উজাড়, শহুরে ব্যস্ততা, আকাশসংস্কৃতির প্রভাব এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্য বিস্মৃত হওয়ার প্রবণতা — সব মিলিয়ে আলপালনের মতো প্রকৃতিবান্ধব উৎসব আজ নতুন প্রজন্মের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠছে, যেমন বিলুপ্তপ্রায় তাইয়ুং-তকচিং পাখির মতো নিজেও বিস্মৃতির পথে। আধুনিক জলবায়ু-অভিযোজন কৌশল প্রণয়নে এই ধরনের ঐতিহ্যবাহী লোকজ্ঞানকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিজ্ঞানের সঙ্গে সমন্বিত করা এবং একই সঙ্গে এই সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলাই হতে পারে ভবিষ্যতের পথ।

পপেন ত্রিপুরা, সংবাদকর্মী ও মুক্ত আলোচক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..