• মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৬ অপরাহ্ন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর: শ্রমনির্ভর সম্পর্ক থেকে কৌশলগত অংশীদারত্বের নতুন অধ্যায়

মো. সহিদুল ইসলাম সুমন / ১৮ দেখেছেন
আপলোড : বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে কিছু সফর কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর তেমনই একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও প্রথম গন্তব্য হিসেবে কুয়ালালামপুরকে বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে একটি সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। এটি শুধু মালয়েশিয়ার প্রতি বাংলাদেশের গুরুত্বের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমাত্রিক এবং বাস্তবভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিরও প্রতিফলন।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি ছিল শ্রমবাজার। গত তিন দশকে প্রায় ১২ থেকে ১৫ লাখ বাংলাদেশি বিভিন্ন সময়ে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমানে দেশটিতে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন, যাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুই দেশের সম্পর্ক এতদিন একটি একপেশে অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল—বাংলাদেশ শ্রম সরবরাহ করবে, মালয়েশিয়া সেই শ্রম গ্রহণ করবে। ফলে শিক্ষা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, গবেষণা ও শিল্প সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনা দীর্ঘদিন অনাবিষ্কৃতই থেকে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই পুরোনো সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় রূপান্তরের চেষ্টা। কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, হালাল অর্থনীতি, শিক্ষা, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা এবং শ্রমবাজারসহ বিস্তৃত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সফর শেষে ঘোষিত ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে ঢাকা ও কুয়ালালামপুর উভয়ই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগ্রহী।

বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার এবং ডিজিটাল সেবাভিত্তিক অর্থনীতি আগামী কয়েক দশকের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হবে। মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ও প্যাকেজিং হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রায় ১৩ শতাংশ ব্যাকএন্ড প্যাকেজিং ও টেস্টিং কার্যক্রম মালয়েশিয়ায় সম্পন্ন হয়। বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই সেখানে বিনিয়োগ করছে। দেশটির সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত প্রযুক্তি খাতে কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার প্রকৌশলী, আইটি বিশেষজ্ঞ ও পলিটেকনিক স্নাতক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান না থাকায় অনেকেই তাঁদের দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছেন না। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ‘ট্যালেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অত্যন্ত সময়োপযোগী। মালয়েশিয়ার প্রযুক্তি ও ডেটা সেন্টার খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ যদি পরিকল্পিতভাবে প্রযুক্তি-দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ করতে পারে, তাহলে তা শুধু রেমিট্যান্স বৃদ্ধি করবে না; বরং দেশে ফিরে আসা দক্ষ কর্মীরা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারবেন।

বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি আয়ের অন্যতম বড় উৎস বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। একই সঙ্গে বহু বাংলাদেশি অধ্যাপক, গবেষক ও বিজ্ঞানী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনাম অর্জন করেছেন। কিন্তু এই মানবসম্পদকে দুই দেশের উন্নয়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ এখনও সীমিত। তাই ‘গ্র্যাজুয়েট প্লাস’ ধরনের কোনো উদ্যোগের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা শেষে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে তা হবে যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার ক্ষেত্র হলো হালাল অর্থনীতি। বৈশ্বিক হালাল শিল্পের বাজারমূল্য বর্তমানে ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি এবং আগামী দশকে এর আকার আরও দ্রুত বাড়বে। মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে হালাল সার্টিফিকেশন, গবেষণা ও রপ্তানি ব্যবস্থায় বিশ্বনেতৃত্বের অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী ও কৃষিপণ্য খাত যদি মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার বিশাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সফরে দুই দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নতুন গতি পাবে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অথচ উভয় দেশের অর্থনীতির আকার, বাজারের সম্ভাবনা এবং শিল্প কাঠামো বিবেচনায় এই বাণিজ্য আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য, চামড়াজাত পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।

জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সফরটি গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি পেট্রোনাসবিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান। এলএনজি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে তাদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে। ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে বাংলাদেশের জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রমবাজার প্রসঙ্গও সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জটিলতা, সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতার কারণে বাংলাদেশি কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় চালু করা, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি সময়ের দাবি। কারণ বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিষয় নয়; এটি দেশের বেকারত্ব হ্রাস ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।

তবে এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। বাংলাদেশকে অবশ্যই ‘লো-স্কিল মাইগ্রেশন’ থেকে ‘হাই-স্কিল মাইগ্রেশন’-এর দিকে অগ্রসর হতে হবে। আগামী দশকে বিশ্ববাজারে যে দক্ষতার চাহিদা বাড়বে, তার মধ্যে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থাপনা। তাই কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান বজায় রেখেছে। বাংলাদেশ চায়, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো মিয়ানমারের ওপর আরও কার্যকর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করুক, যাতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি হয়। এই ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার সমর্থন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পদ।

এছাড়া আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি)-এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নেও মালয়েশিয়ার সমর্থন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে।

তবে বাস্তবতার নিরিখে একটি বিষয় স্মরণ রাখা জরুরি। অতীতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বহু সমঝোতা স্মারক, যৌথ ঘোষণা এবং উচ্চপর্যায়ের সফর হয়েছে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলোর বাস্তবায়ন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে এবারের সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। এজন্য নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা, বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং প্রবাসী বাংলাদেশি পেশাজীবীদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর তাই কেবল একটি কূটনৈতিক সফর নয়; এটি দুই দেশের সম্পর্কের একটি সম্ভাব্য টার্নিং পয়েন্ট। যদি এই সফরের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ঢাকা-কুয়ালালামপুর সম্পর্ক শ্রমনির্ভর সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে প্রযুক্তি, জ্ঞান, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনভিত্তিক কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিতে পারে। সেই রূপান্তর শুধু দুই দেশের অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করবে না; বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সহযোগিতার একটি নতুন মডেলও সৃষ্টি করবে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি। তাহলেই এই সফর ইতিহাসের পাতায় আরেকটি আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে নয়, বরং দুই দেশের যৌথ সমৃদ্ধির নতুন যুগের সূচনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..