• মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০২:১৫ অপরাহ্ন

জাতীয়করণের ঘোষণায় উচ্ছ্বাস, কিন্তু বিনা বেতনের শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

থানচি, (বান্দরবান) / ৬৯ দেখেছেন
আপলোড : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

থানচির দুর্গম তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৬ বছরের ত্যাগ কি মূল্যায়িত হবে, নাকি বাদ পড়বেন প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষকরা?

বান্দরবানের দুর্গম থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের ঘোষণা ঘিরে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মাঝে আনন্দের বন্যা বইলেও দীর্ঘদিন বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করে আসা প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। তাদের প্রশ্ন—যে বিদ্যালয় গড়ে তুলতে বছরের পর বছর ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জাতীয়করণের পর সেই বিদ্যালয়েই কি তারা শিক্ষকতা করার সুযোগ পাবেন?

গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার কথা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার পর প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ নতুন আশার আলো দেখলেও জাতীয়করণের কঠোর শর্ত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সদস্যরা।
পরিত্যক্ত টিনশেডে শুরু, স্বপ্নের বিদ্যালয়ের পথচলা
২০২০ সালে একটি পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে যাত্রা শুরু হয় তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। আগে এটি ছিল প্রায় তিন একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত তিন্দু গ্রুপিং পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবন। নতুন ভবনে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থানান্তরের পর পরিত্যক্ত সেই টিনশেড সংস্কার করেই শুরু হয় মাধ্যমিক স্তরের পাঠদান।
তৎকালীন তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মংপ্রুঅং মারমার অর্থায়ন ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। পাঁচজন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয় এবং রেমাক্রী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং (মিংলেন)-কে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২০২২ সালে চেয়ারম্যান পরিবর্তনের পর নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা বিদ্যালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিদ্যালয়ের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকাও প্রদান করেন, যার আয় দিয়েই শিক্ষক বেতন ও বিদ্যালয়ের নানা ব্যয় নির্বাহ করা হচ্ছে।
প্রধান শিক্ষকই চালান ইঞ্জিন বোট
দুর্গম এই বিদ্যালয়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং (মিংলেন) নিজেই ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের অর্থ সংগ্রহ করেন। শিক্ষার আলো টিকিয়ে রাখতে তাঁর এই ব্যতিক্রমী সংগ্রাম দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। সেই মানবিক গল্প জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর পরই জাতীয়করণের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়।
বাস্তব চিত্রে শিক্ষার্থী ২৯, কাগজে ৫২
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ টিনশেডের চার কক্ষের তিনটিতে পাঠদান চলছে, অপর কক্ষটি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশের একটি কক্ষে ছাত্রাবাসের মতো পরিবেশে কয়েকজন শিক্ষার্থী অবস্থান করছে।
বিদ্যালয়ে উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ২৯ জন। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৮ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ৯ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ৮ জন এবং নবম শ্রেণিতে ৪ জন। তবে কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ৫২ জন।
একইভাবে বাস্তবে তিনজন শিক্ষক নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও নথিতে ১৩ জন শিক্ষকের নাম রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তালিকাভুক্ত অনেক শিক্ষক অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
৪০ মাস বেতনহীন শিক্ষক
সহকারী শিক্ষক পাওং ম্রো বলেন,
“২০২০ সালে মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতনে যোগদান করি। কিন্তু প্রায় ৪০ মাস কোনো বেতন পাইনি। এলাকার দরিদ্র শিশুদের কথা ভেবে এখনো পাঠদান করে যাচ্ছি। বেতন না পাওয়ায় শিক্ষক নিবন্ধন কিংবা বিএড করাও সম্ভব হয়নি।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নথিতে থাকা অনেক শিক্ষক অন্যত্র কর্মরত। জাতীয়করণ হলে তারা ফিরে আসবেন কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী পংএ খুমী, নাংথং ম্রো, থুইমেচিং মারমা ও চন্দ্রা ত্রিপুরা জানায়,
“আমাদের পরিবার খুবই দরিদ্র। অনেক সময় স্কুলের বেতনও দিতে পারি না। টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রী বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছেন শুনে আমরা খুব খুশি। আমরা পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হতে চাই।”
জাতীয়করণের শর্তই বড় বাধা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয়করণের ক্ষেত্রে সাধারণত কমপক্ষে ১২০ জন শিক্ষার্থী, নিজস্ব জমি, স্থায়ী ভবন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পর্যাপ্ত শৌচাগার, নিবন্ধিত শিক্ষক, স্বচ্ছ নিয়োগ এবং শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত পরিচালনা ব্যবস্থা বিবেচনায় নেওয়া হয়।
কিন্তু তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এসব শর্তের অনেকগুলোই পূরণ করতে পারেনি। ফলে জাতীয়করণের পর প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষকরা বাদ পড়ার আশঙ্কা করছেন।
“ত্যাগের মূল্য যেন হারিয়ে না যায়”
সহকারী শিক্ষক পুচিংমং মারমা বলেন,
“ছয়-সাত বছর ধরে বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করেছি। জাতীয়করণের কঠোর শর্তের কারণে যদি আমরা বাদ পড়ে যাই, তাহলে আমাদের এই ত্যাগের মূল্য কোথায়?”
সহকারী শিক্ষিকা কাইলং খুমী ও নাংছুং খুমী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, দুর্গম অঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় এনে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ শিথিলতার ব্যবস্থা করা উচিত।
অভিভাবকদেরও একই দাবি
অভিভাবক চিংথোয়াইপ্রু মারমা বলেন,
“জাতীয়করণের ঘোষণা আমাদের জন্য আনন্দের খবর। তবে যেসব শিক্ষক বছরের পর বছর বিনা বেতনে আমাদের সন্তানদের পড়িয়েছেন, তাদের যেন কোনোভাবেই অবমূল্যায়ন করা না হয়।”
প্রধান শিক্ষকের আকুতি
প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং (মিংলেন) বলেন,
“আমি এই দুর্গম এলাকার সন্তান। স্বাধীনতার পরও এখানে এসএসসি পাস শিক্ষার্থী পাওয়া ছিল বিরল। তাই যত কষ্টই হোক বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছি। চেয়ারম্যান ও উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া ইঞ্জিন বোট চালিয়ে শিক্ষকদের বেতনের ব্যবস্থা করছি। আমাদের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও বাস্তবতা বিবেচনা করে জাতীয়করণের সময় প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষকদের জন্য শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানাই।”
চেয়ারম্যানের বক্তব্য
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা বলেন,
“দেশের অন্যতম দুর্গম ইউনিয়ন এটি। এখানে এখনো মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, শিক্ষার হারও কম। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে অনুরোধ করবো, এই বিদ্যালয় গড়ে তোলা শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির দীর্ঘদিনের অবদান যেন যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়।”
প্রশ্ন রয়ে গেল
জাতীয়করণের ঘোষণা নিঃসন্দেহে প্রত্যন্ত তিন্দু অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। তবে একই সঙ্গে বড় প্রশ্নও সামনে এসেছে—যারা বছরের পর বছর বিনা বেতনে, সীমাহীন কষ্ট আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রেখেছেন, জাতীয়করণের কঠোর শর্তের কারণে সেই মানুষগুলোকেই যদি বাদ পড়তে হয়, তাহলে রাষ্ট্র কি তাদের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারবে?


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..