সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে মনীষীদের জীবনকর্ম নিয়ে আলোকপাতের লক্ষ্যে উন্নয়নকর্মী, সমাজকর্মী ও লেখক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার সাহিত্যকর্ম নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (১৯ জুন) বিকাল ৫টায় খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের হলরুমে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খাগড়াছড়ির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সভায় আলোচকরা মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার বহুমুখী সাহিত্যকর্ম ও উন্নয়নমূলক অবদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
আলোচনায় বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও গবেষক প্রভাংশু ত্রিপুরা, উন্নয়ন ও সমাজকর্মী অরুণ কান্তি চাকমা এবং লেখক আর্য্যমিত্র চাকমাসহ অন্যান্যরা। বক্তারা বলেন, মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা এই বয়সেই যেভাবে সমাজকে আলোকিত করছেন, শেষ বয়সে গিয়ে তিনি পূর্ণচন্দ্রের মতো পৃথিবীকে আলো বর্ষণ করবেন। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে তাঁর লেখা গান পরিবেশন ও কবিতা আবৃত্তি করা হয়।
আলোচনায় উঠে আসে, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে যখন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু হয়, তখন থেকেই এই অঞ্চলের উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা। সেই থেকে তিনি দেশের বিভিন্ন ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন। মাতৃভাষা শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও কমিউনিটি ক্ষমতায়নসহ উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি নানা গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেছেন এবং ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
বক্তারা জানান, জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরাম, শিক্ষা বিষয়ক জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞ সভা, জাতিসংঘ সংখ্যালঘু ফোরাম, বহুভাষিক শিক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনসহ সরকারি, বেসরকারি, দ্বিপাক্ষিক সংস্থা ও জাতিসংঘ পরিচালিত বিভিন্ন পরামর্শসভা, কর্মশালা ও সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা।
পেশায় একজন উন্নয়নকর্মী মথুরা বিকাশ লেখেন নিজ মাতৃভাষা ককবরক, বাংলা ও ইংরেজিতে। এককভাবে ১৭টি এবং যৌথভাবে ৭০টির অধিক বই, শিখন উপকরণ, শিশুতোষ গল্পের বই ও প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছেন তিনি। এছাড়া এককভাবে ২০টি এবং যৌথভাবে ১৫টির অধিক সাহিত্য সংকলন, উন্নয়ন জার্নাল ও সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন।
শিক্ষা, মাতৃভাষায় শিক্ষা ও ভাষা গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি গিরিধারা সাহিত্য সম্মাননা ২০২৫, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা জাতীয় পদক ২০২১, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গবেষণা সম্মাননা ২০২০, পার্বত্য বৌদ্ধ এসোসিয়েশন ভাষা সম্মাননা ২০১৮ ও আলটুইস্টিক শিক্ষা সম্মাননা ২০১৭-সহ একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। বহুভাষিক শিক্ষা, কমিউনিটি ক্ষমতায়ন, স্থানীয় সরকার, ঐতিহ্যবাহী শাসনব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনাসহ সুশাসন ও উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত। পেশা ও সাহিত্যকর্মের সূত্রে তিনি ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন।
বর্তমানে তিনি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা জাবারাং কল্যাণ সমিতিতে কর্মরত আছেন। ২০০০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক। তাঁর স্ত্রী কৃত্তিকা ত্রিপুরা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। ১৯৭৪ সালের ২৬ মে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা বরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক এবং মা সবিতা রাণী ত্রিপুরা ছিলেন গৃহিণী।
অনুষ্ঠানে বক্তারা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও মাতৃভাষা শিক্ষা বিস্তারে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তরুণ প্রজন্মকে তাঁর জীবনকর্ম থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার আহ্বান জানান।