• বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০২:৫২ পূর্বাহ্ন
হেডলাইন :
রুহিয়ায় শুক নদীকে ঘিরে ভুমিহীন রবিউলের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের নিয়মিত চোখের পরীক্ষা জরুরি—এমপি সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম ভারপ্রাপ্তের ভারে মুখ থুবড়ে পড়েছে পাটগ্রামের সাব রেজিষ্ট্রি ও ভূমি অফিসের সেবা কার্যক্রম পাতলীতে পূবালী ব্যাংক পিএলসি’র উদ্যোগে বাংলা কিউআর ক্যাম্পেইনের শুভ উদ্বোধন দিনাজপূর (৪২ বিজিবি) ঠাকূরগাঁওয়ে পীরগঞ্জ সীমান্তে মদ আটক ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করবো, স্থানীয় নির্বাচনে থাকবে বিএনপির একক প্রার্থী” ঝালকাঠি সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সভায় — অ্যাড. মো. শাহাদাৎ হোসেন পানছড়িতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে রোপা আমান বীজ বিতরণ সাংবাদিকদের কল্যাণে সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে: বরিশালে তথ্যমন্ত্রী

স্বপ্ন পুঁজি করে এগিয়ে চলা: সংগ্রাম পেরিয়ে স্বাবলম্বিতার পথে দীঘিনালার নারী উদ্যোক্তা হালিমা খাতুন।

মো. হাচান আল মামুন, দীঘিনালা প্রতিনিধি। / ২১৪ দেখেছেন
আপলোড : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬

অভাব, অনিশ্চয়তা আর প্রতিকূলতা—এই তিনটিকেই সঙ্গী করে এগিয়ে চলেছেন খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা হালিমা খাতুন। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি,বরং প্রতিটি বাধাকেই পরিণত করেছেন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিতে। সীমিত মূলধন, পারিবারিক সংকট এবং সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তিনি আজ আত্মকর্মসংস্থানের এক অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত।

দীঘিনালা উপজেলার এই সংগ্রামী নারী নিজের অল্প কিছু সঞ্চয় দিয়ে শুরু করেন স্বপ্নের পথচলা। বর্তমানে হালিমা মিষ্টি এন্ড কেক কর্নার নামে তিনি স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে হোমমেড কেক তৈরি ও বিক্রির পাশাপাশি নারীদের জন্য ফ্যাশনেবল পোশাক তৈরি ও বিক্রির কাজ করছেন। তার তৈরি কেক ও পোশাকের মান, সাশ্রয়ী মূল্য এবং আন্তরিক ব্যবহারের কারণে অল্প সময়েই স্থানীয় ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।

হালিমা খাতুন জানান, উদ্যোক্তা হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। তবে সেলাই কাজের সঙ্গে তার পথচলা ২০১৫ সাল থেকে। দীর্ঘদিনের সেই অভিজ্ঞতাই আজ তার উদ্যোক্তা জীবনের মূল ভিত্তি।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালে একটি ছোট খামার গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে এক বছরের মধ্যেই সেটি বন্ধ করে দিতে হয়। তখন অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। পরে ভেঙে না পড়ে ২০২৫ সালে হালিমা মিষ্টি এন্ড কেক কর্নার’ প্রতিষ্ঠা করে হোমমেড কেকের ব্যবসা শুরু করি। ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা পাচ্ছি। এখন আমার স্বপ্ন, এই ছোট উদ্যোগকে বড় একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া।

জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন বেকার থাকার পর সংসারের স্বচ্ছলতার আশায় আমার স্বামী ঋণ নিয়ে প্রবাসে যান। কিন্তু প্রত্যাশিত আয় না হওয়ায় সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই আমার কাঁধে এসে পড়ে। তখন বুঝতে পারি, পরিবারের জন্য আমাকে নিজেকেই কিছু করতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ১০ থেকে ১৫টি কেক বিক্রি করেন হালিমা খাতুন। ‘হালিমা মিষ্টি এন্ড কেক কর্নার’ থেকে অর্জিত এই আয় দিয়েই কোনোরকমে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করেন। তার দুই ছেলে রয়েছে। বড় ছেলের বয়স ৬ বছর এবং ছোট ছেলের বয়স আড়াই বছর। স্বামী প্রবাসে থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে বর্তমানে বাবার বাড়িতেই সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। তার বাবা একটি ছোট চায়ের দোকান পরিচালনা করেন। সীমিত আয়ের সেই পরিবারেই নিজের পরিশ্রম, মেধা ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রতিদিন নতুন স্বপ্ন বুনছেন এই নারী উদ্যোক্তা।

তিনি আরও বলেন, সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহজ শর্তে ঋণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলে ব্যবসাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাই। শুধু নিজের জন্য নয়, ভবিষ্যতে এলাকার আরও নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।

স্থানীয় ক্রেতা হৃদয় হোসেন বলেন, হালিমা আপুর তৈরি কেকের মান খুবই ভালো। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরি হওয়ায় আমরা নিশ্চিন্তে অর্ডার করি। তার তৈরি পোশাকও মানসম্মত এবং সাশ্রয়ী।

নিয়মিত ক্রেতা সুমাইয়া বিন্তা ইয়াসমিন বলেন, আমি নিয়মিত আমাদের বাসার বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও পারিবারিক আয়োজনের জন্য ‘হালিমা মিষ্টি এন্ড কেক কর্নার’ থেকে কেক নিয়ে থাকি। তার তৈরি কেক খুবই সুস্বাদু, স্বাস্থ্যসম্মত এবং মানসম্মত। অর্ডার অনুযায়ী সময়মতো সরবরাহও করেন। তাই আমি সবসময় তার ওপর আস্থা রাখি।

৩ নং কবাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নলেজ চাকমা বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসা অত্যন্ত ইতিবাচক। হালিমা খাতুনের মতো উদ্যোগী নারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে তারা শুধু নিজেরাই স্বাবলম্বী হবেন না, বরং অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ  তানজিল পারভেজ  বলেন, নারী উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। হালিমা খাতুনের মতো পরিশ্রমী উদ্যোক্তারা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করছেন, যা সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সম্পর্কে তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এমন উদ্যোগ আরও বিকশিত হলে স্থানীয় অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
স্থানীয়দের মতে, সীমিত সামর্থ্য নিয়েও সততা, দক্ষতা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে সফলতার পথে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব উদাহরণ হালিমা খাতুন। ‘হালিমা মিষ্টি এন্ড কেক কর্নার’-এর মাধ্যমে তার এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে এলাকার অনেক নারীকে আত্মকর্মসংস্থানের পথে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করছে।

সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। তবুও হালিমা খাতুন বিশ্বাস করেন, একদিন ‘হালিমা মিষ্টি এন্ড কেক কর্নার’ একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। আর সেই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুধু নিজের পরিবারের নয়, এলাকার অনেক অসহায় ও কর্মহীন নারীর জীবনেও স্বাবলম্বিতার নতুন আলো জ্বালাতে পারবেন। তার এই অদম্য প্রত্যয়ই বলে দেয়—স্বপ্ন যদি সত্যিই নিজের হয়, তবে প্রতিকূলতা কখনোই শেষ গন্তব্য নয়; বরং সেটিই নতুন পথচলার প্রেরণা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..