• বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৫ পূর্বাহ্ন
হেডলাইন :

১৬ বছরের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: কেন নিষেধাজ্ঞা জরুরি?

​নুর আহমদ সিদ্দিকী / ৫২ দেখেছেন
আপলোড : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির অতিব্যবহার এবং অপব্যবহার, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ওপর যে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা এখন গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশই বিষয়টির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে নড়েচড়ে বসেছে। আমাদের দেশেও এখন সময় এসেছে ১৬ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে জোরালো আলোচনার।

​কেন এই নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন?
​কিশোর বয়সে মানুষের মস্তিষ্ক এবং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বিকশিত হতে থাকে। এই সংবেদনশীল সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

​মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাজানো জীবনের সাথে নিজের জীবনের তুলনা করে অনেক কিশোর-কিশোরী বিষণ্ণতা, হীনম্মন্যতা ও উদ্বেগের শিকার হচ্ছে।

​সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি: কিশোর-কিশোরীরা সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষের ফাঁদে পড়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।

​আসক্তি ও মনোযোগের অভাব: সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখতে ডিজাইন করা। এতে পড়াশোনা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে তাদের মনোযোগ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
​শারীরিক সমস্যা: দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, স্থূলতা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব তাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।
​বিশ্বজুড়ে বাড়ছে সচেতনতা ও নিষেধাজ্ঞা

​বিশ্বের অনেক দেশ কিশোর-কিশোরীদের ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন কার্যকর করেছে। এছাড়া:
​মালয়েশিয়া: ২০২৬ সালের জুন থেকে দেশটিতে ১৬ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোতে অ্যাকাউন্ট খোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিয়ম না মানলে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে মোটা অঙ্কের জরিমানার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
​ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিল: এই দেশগুলোতেও কিশোর বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ ও অভিভাবকীয় তদারকির কঠোর নিয়ম চালু রয়েছে।
​যুক্তরাজ্য: দেশটির সরকার ১৬ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে, যা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
​প্রস্তাবিত উদ্যোগ: গ্রিস ২০২৭ সাল থেকে ১৫ বছরের নিচে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া নরওয়ে, ডেনমার্ক, কানাডা, তুরস্ক, অস্ট্রিয়া ও স্লোভেনিয়ার মতো দেশগুলোতেও এই বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের আইন তৈরির কাজ চলছে।

​নিষেধাজ্ঞার যৌক্তিকতা ও প্রত্যাশিত ফলাফল
​প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রযুক্তি কি নিষিদ্ধ করা সম্ভব? এখানে মূল লক্ষ্য হলো ‘সুরক্ষা’। ১৬ বছর পর্যন্ত একটি বয়সসীমা নির্ধারণ করলে কিশোর-কিশোরীরা বয়ঃসন্ধিকালের গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকুতে বাইরের জগতের অপ্রয়োজনীয় চাপমুক্ত থাকতে পারবে। তারা বাস্তব জগতের মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ এবং সামাজিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে।

​এর ফলে যে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো আশা করা যায়:

১. উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার হার অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
২. শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও সৃজনশীল কাজে বেশি মনোযোগী হতে পারবে।
৩. ভার্চুয়াল জগতের চেয়ে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সাথে সরাসরি কথা বলার প্রবণতা বাড়বে।
৪. সাইবার বুলিং ও ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে তারা সুরক্ষিত থাকবে।
​প্রযুক্তির উন্নয়নকে থামিয়ে দেওয়া আমাদের লক্ষ্য নয়, বরং প্রযুক্তি যেন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাল না হয়ে ওঠে তা নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য। অস্ট্রেলিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো উন্নত দেশগুলো যখন নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ডিজিটাল আসক্তি ও সাইবার ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে এমন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশকেও এ বিষয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাষ্ট্র, অভিভাবক এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গঠন করা এখন সময়ের দাবি।

লেখকঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..