জমি ক্রয়-বিক্রয়, দলিল নিবন্ধন ও সরকারি রাজস্ব আদায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা দেওয়ার কথা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর। কিন্তু লালমনিরহাট জেলার সীমান্তবর্তী পাটগ্রাম উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে সহকারী কমিশনার ভূমি (এসি ল্যান্ড) ও সাব-রেজিস্ট্রারের পদ দুটি শূন্য রয়েছে। সপ্তাহে পাঁচ দিনের পরিবর্তে মাত্র ১/২ দিন অফিস চালু থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবাগ্রহীতারা। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারের রাজস্ব আদায়।দীর্ঘদিন এ পদ দুটিতে স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় সুত্রে এবং তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, জেলার পাটগ্রাম উপজেলায় সাবরেজিস্টার ও সহকারী কমিশনার ভূমি (এসিল্যান্ড) পদ দুটি দীর্ঘদিন পর্যন্ত শুন্য রয়েছে। এ দুটি পদে বর্তমানে নিজস্ব কোন কর্মকর্তা নেই। জানা গেছে, পাটগ্রাম উপজেলায় ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে অদ্যবদি সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদটিতে স্থায়ী কর্মকর্তা পদায়ন হয়নি । এই সময়ের মধ্যে ৫ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতিরিক্ত কিংবা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে এ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। উপজেলার এই পদটিতে এখন পর্যন্ত ৩৬ জন কর্মকর্তার রদবদল হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৩ জনই ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা গেছে।
অপর দিকে উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রারের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে অদ্যবদি নিয়মিত বা স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা নেই। দীর্ঘ এ সময়ে ৮ জন সাব-রেজিস্ট্রার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। বিগত ১৯৭৭ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় ৫০ বছরে ৪০ জন কর্মকর্তা সাব-রেজিস্ট্রার পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এদের মধ্যে ২২ জন বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে এসে অতিরিক্ত বা খণ্ডকালীন দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সকল কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেও তাদের মূল কর্মস্থলের পাশাপাশি অতিরিক্ত চাপ সামলাতে গিয়ে একদিকে যেমন নিজেদেরকে হিমশিম খেতে হচ্ছে অপরদিকে তেমনি এতে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, বিরম্বনা ও ভোগান্তি বাড়ছে সেবা গ্রহীতাদের।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে শূন্য রয়েছে পাটগ্রাম সাব-রেজিস্ট্রার পদটি। ২০১৭ সালে সর্বশেষ কর্মকর্তা বদলি হওয়ার পর প্রায় নয় বছরেও পাটগ্রাম উপজেলায় এ পদে নতুন কোনো কর্মকর্তা পদায়ন হয়নি।
বর্তমানে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার রাশেদুজ্জামান সপ্তাহে মাত্র ১ দিন এখানে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে তিনি লালমনিরহাট সদর উপজেলাতেও অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন।
লালমনিরহাটের পাটগ্রামে এ পদে স্থায়ী কোন কর্মকর্তা পদায়িত না হওয়ায় উপজেলার ভূমি-সংক্রান্ত ও সাধারণ জরুরি সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে সেবা নিতে আসা শত শত মানুষ চরম ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
অথচ উপজেলা ভূমি ও সাব-রেজিস্ট্রি এ দুটি সরকারি দপ্তরের ওপর পুরো উপজেলার বাসিন্দাদের জমির মালিকানা, কেনাবেচা, নামজারি ও খাজনা-খারিজসহ নানা আইনি প্রক্রিয়া নির্ভর করে। কিন্তু পদ দুটিতে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় এতে জন ভোগান্তী বাড়ছে দিন দিন। বর্তমানে পাটগ্রাম উপজেলায় যে সাব-রেজিস্ট্রার দায়িত্ব পালন করছেন তার মূল কর্মস্থল কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলায় এবং তিনি একই সঙ্গে লালমনিরহাট সদর উপজেলা ও পাটগ্রাম উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। সাপ্তাহিক কর্মদিবসের রোববার থেকে সোমবার লালমনিরহাট সদর কার্যালয়ে, মঙ্গল ও বুধবার রাজারহাট এবং বৃহস্পতিবার মাত্র ১ দিন পাটগ্রাম কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।অপরদিকে সহকারী কমিশনার ভূমি না থাকায়
পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ভূমি কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি উপজেলা এবং পৌর প্রশাসক হিসেবে আরও দুটি দপ্তরের কাজ করেন। এতে করে কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সময়মতো সব কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। ফলে জনসাধারণ ভোগান্তির শিকার হন।
ভুক্তভোগী সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ জানান, ভূমি সংক্রান্ত কাজে বিশেষ করে জমি ক্রয়-বিক্রয় ও মালিকানা স্বত্ব বজায় রাখতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজন ছাড়াও অন্যান্য দরকারে উপজেলা ভূমি এবং সাব-রেজিস্ট্রি দপ্তরের প্রধান কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত দালিলিক প্রমাণ পত্রের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ভূমি কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) না থাকায় জমির নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়, ভূমি সংক্রান্ত আপত্তি নিষ্পত্তি, সরকারি জমি রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন থেকে চলছে চরম স্থবিরতা।
অপরদিকে জমি রেজিস্ট্রেশনের জন্য সাপ্তাহিক কার্যদিবসগুলোতে নিয়মিত সাব-রেজিস্ট্রারের উপস্থিতি না থাকায় প্রয়োজনীয় সময়ে দলিল নিবন্ধনের কাজ করা যায় না। এতে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষকেই অতিরিক্ত সময়, অর্থ ও ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। পাশাপাশি সরকার এই দুই দপ্তর হতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে পাটগ্রাম দলিল লেখক সমিতির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আকতারুজ্জামান মিন্টু সংবাদ মাধ্যমকে বলেন,‘সীমান্তবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাব-রেজিস্ট্রার পদের এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থায়ী কর্মকর্তা নাই। কর্মকর্তা না থাকায় কাজের গতি কমে গেছে। সাধারণ মানুষের দাবি, সরকার শূন্য পদে কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে ভূমি ও রেজিস্ট্রেশন সেবায় হয়রানি বন্ধে ব্যবস্থা নেবেন।”
পাটগ্রাম বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও পাটগ্রাম উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শওকত হায়াত প্রধান বাবু বলেন, ‘ভূমি প্রশাসন ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এসব দপ্তরে দীর্ঘদিন কর্মকর্তা না থাকা শুধু জনভোগান্তিই বাড়ায় না, বরং সরকারি রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই জনস্বার্থে দ্রুত এই পদে কর্মকর্তা পদায়ন করা জরুরি।”
এ ব্যাপারে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ‘এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিতভাবে জানানো হয়েছে।