• বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪৭ অপরাহ্ন
হেডলাইন :
সবাইকে সুন্দরবনের গুরুত্ব বুঝতে হবে মোংলায় আর্থস্কাউট স্কুল ক্যাম্পেইনের আয়োজনে বক্তারা দৌলতপুর আলিম মাদ্রাসায় হেফজ বিভাগের কোরআন শরীফ পাঠদান কার্যক্রমের শুভ সূচনা মোহনগঞ্জে বিএডিসির বীজে নষ্ট কয়েক হাজার কাঠা জমির বোরো ফসল কৃষক দিশেহারা বেনাপোল বন্দরে ক্রেন দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিক শাহাজানের জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। ৬ বছর পর আনোয়ারায় ফিরছে ১৩০ বছরের বৈশাখী মেলা ও বলী খেলা ডায়ালাইসিস এর কষ্ট সহ্য হয়না, রাজবাড়ীর ভ্যানচালক শরিফুল বাঁচতে চায় নড়াইলের লোহাগড়ায় দাফনের ৭ মাস পর পার্ক ব্যবস্থাপকের মরদেহ উত্তোলন ও ট্রেনে কাটা পড়ে বৃদ্ধ নিহত কিশোরগঞ্জে ফিসারি দখলের পাঁয়তারা, অপপ্রচারের অভিযোগ

বাধ্যতামূলক যাকাত ব্যবস্থা: দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে ভুমিকা রাখবে

Reporter Name / ৯৬ দেখেছেন
আপলোড : মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হলেও এখনো দেশে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং সামাজিক বৈষম্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। অথচ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যাকাত সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে এই সমস্যাগুলোর বড় একটি সমাধান সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে যদি সঠিকভাবে যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের ব্যবস্থা চালু করা যায়, তবে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা (১ ট্রিলিয়ন টাকা) বা তারও বেশি যাকাত সংগ্রহ করা সম্ভব। কিছু গবেষণা অনুযায়ী এই পরিমাণ ১.২ ট্রিলিয়ন টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এত বিপুল অর্থ সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবহার করা গেলে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে এটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্ভাবনা বনাম বর্তমান বাস্তবতা:

বাংলাদেশের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের ঘোষিত সর্বোচ্চ জাতীয় বাজেটের আকার ছিল প্রায় ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। সেই তুলনায় সম্ভাব্য ১ লাখ কোটি টাকার যাকাত জাতীয় বাজেটের প্রায় সাত ভাগের এক ভাগ সমান।

অন্যদিকে দেশের দরিদ্র, অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়:

২০২৫–২৬ অর্থবছরে সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রায় ১৩,৯৯১ কোটি টাকা।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়:

২০২৪–২৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫,২২২ কোটি টাকা।

২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা কিছুটা কমিয়ে ৫,০৭৮ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।

অর্থাৎ, সম্ভাব্য যাকাতের পরিমাণ এই দুই মন্ত্রণালয়ের বাজেটের তুলনায় বহু গুণ বেশি। তাই সঠিকভাবে যাকাত সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করা গেলে তা দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে।

দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের শক্তি:

অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে যাকাত সংগ্রহ করা হয় এবং তা পরিকল্পিতভাবে বণ্টন করা যায়, তবে আগামী ১০–১৫ বছরের মধ্যে দেশের দারিদ্র্যের হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসা সম্ভব।

এই অর্থ দিয়ে একদিকে যেমন দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নত করা যাবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা সম্ভব হবে। এমনকি ভবিষ্যতে এমন অবস্থাও সৃষ্টি হতে পারে, যখন বাংলাদেশের মানুষ তাদের যাকাতের অর্থ বিশ্বের অন্যান্য দরিদ্র দেশে সাহায্য হিসেবে পাঠাতে পারবে।

যাকাত: দয়া নয়, অধিকার-

ইসলামের দৃষ্টিতে যাকাত কোনো দান বা অনুগ্রহ নয়। এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি ফরজ বিধান, যেখানে ধনীদের সম্পদের নির্দিষ্ট অংশে গরিবদের অধিকার রয়েছে।

অতএব, যাকাত ধনী মানুষের দয়া বা দান নয়; বরং এটি গরিব মানুষের ন্যায্য অধিকার। যদি এই ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনগত কাঠামোর মধ্যে এনে বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে এর সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছানো সম্ভব।

বর্তমান সমস্যাগুলো কোথায়:?

বাংলাদেশে বর্তমানে যাকাত রাষ্ট্রীয়ভাবে বাধ্যতামূলক নয়। ফলে অধিকাংশ মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা বিভিন্ন বেসরকারি ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাকাত প্রদান করেন। এর ফলে কয়েকটি বড় সমস্যা দেখা যায়—

সরকারি যাকাত ফান্ডে মাত্র কয়েক কোটি টাকা সংগ্রহ হয়।

অনেকেই যাকাতের সঠিক হিসাব করেন না।

অনেক ধনী ব্যক্তি যাকাত হিসেবে শাড়ি, লুঙ্গি বা কাপড় বিতরণ করেই দায়িত্ব শেষ মনে করেন।

কিন্তু ইসলামের মূল উদ্দেশ্য কেবল সাময়িক সহায়তা নয়; বরং দারিদ্র্য দূরীকরণ ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি।

একজন দরিদ্র মানুষকে খাবার বা কাপড় দিলে তা সাময়িকভাবে তার প্রয়োজন মেটায়। কিন্তু যদি তাকে একটি আয়ের উৎস তৈরি করে দেওয়া যায়—যেমন ছোট ব্যবসা, কৃষিকাজ বা প্রশিক্ষণ—তাহলে সে স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে।

যাকাত আদায়ের মৌলিক নিয়ম

২০২৬ সাল (১৪৪৭ হিজরি) অনুযায়ী বাংলাদেশে যাকাতের নিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে ৫২.৫ ভরি রূপার বাজারমূল্যের ভিত্তিতে, যা আনুমানিক ১, ২,৩০,০০০( + -) টাকার মধ্যে।

যদি কারো কাছে এক চন্দ্রবছর ধরে এই পরিমাণ বা তার বেশি সম্পদ থাকে, তবে তাকে মোট নিসাবযোগ্য সম্পদের ২.৫% বা চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে।

নিসাব নির্ধারণের সময় সাধারণত নিচের সম্পদগুলো গণনায় আসে

 

সোনা ও রূপা

নগদ অর্থ

ব্যবসার পণ্য

গবাদিপশু

ফসল

 

সমাজের প্রতি আহ্বান:

বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের কাছে আমার বিনীত আহ্বান—

যাদের উপর যাকাত ফরজ হয়েছে, তারা যেন শুধু কয়েকটি কাপড় বিতরণ করে দায়িত্ব শেষ মনে না করেন। বরং সঠিক হিসাব করে এমনভাবে যাকাত প্রদান করুন, যাতে একজন দরিদ্র মানুষ স্বাবলম্বী হতে পারে।

আপনি যাকে এই বছর যাকাত দিচ্ছেন, চেষ্টা করুন যেন আগামী বছর তাকে আর যাকাত নিতে না হয়—বরং সে নিজেই স্বাবলম্বী হয়ে অন্যকে সাহায্য করতে পারে।

সরকারের প্রতি আহ্বান:

বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত ও অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি সুসংগঠিত যাকাত ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।

সেই লক্ষ্যে সরকারের প্রতি আহ্বান—

সংসদে আইন পাস করে যাকাত ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে আনা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

যদি তা করা যায়, তবে যাকাত শুধু একটি ধর্মীয় বিধান হিসেবেই নয়, বরং দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

শেখ নাইম

লেখক ও কলামিস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..