বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। বহিরাগত নানা অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আহরণের নিম্নগতির চেয়েও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাতের চরম বিশৃঙ্খলা। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নানা অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, অপরিকল্পিত ও দুর্বল ঋণ বিতরণ, অতিমূল্যায়িত জামানত, বিশেষ সুবিধায় বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের সংস্কৃতি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের প্রতি একধরনের অদৃশ্য নমনীয়তা—সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের মেরুদণ্ড আজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এই বাস্তবতার অভিঘাত কেবল কয়েকটি ব্যাংকের ব্যালান্সশিট বা আমানতকারীদের উদ্বেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নতুন শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রাজস্ব আহরণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সফর শেষে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে গেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের পরিষ্কারকরণ বা ‘ক্লিনআপ’—এই তিনটি বিষয়ই সামষ্টিক অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। দৃঢ় ও সাহসী সংস্কার বাস্তবায়ন করা না গেলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৩.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং মধ্যমেয়াদে তা আরও কমে ৩ শতাংশের নিচে চলে যেতে পারে। যেখানে সরকারের ঘোষিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থার এমন পূর্বাভাস অর্থনীতির ভেতরে জমে থাকা গভীর কাঠামোগত দুর্বলতারই স্পষ্ট সংকেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মুদ্রানীতি পর্যালোচনার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংকিং খাতে প্রদর্শিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। এর আগের মাত্র এক প্রান্তিকেই নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
তবে ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত সংকট এই পৌনে ছয় লাখ কোটি টাকার দৃশ্যমান অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। মূল লেজারের বাইরে অবলোপন (রাইট-অফ) করে রাখা হয়েছে প্রায় ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। বিশেষ সুবিধার আওতায় পুনঃতফসিল করে নিয়মিত দেখানো ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। এছাড়া বিভিন্ন মামলাধীন প্রকল্পে আটকে থাকা ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট ১৮.২৫ লাখ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ বা সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ ১১ লাখ কোটি টাকারও বেশি, যা মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকগুলোকে কার্যত ঋণ আদায়ের প্রশাসনিক অফিসে পরিণত করা হয়েছে। অথচ ব্যাংকের মূল দায়িত্ব কেবল ঋণ আদায়ের পেছনে ছুটে সময় নষ্ট করা নয়; ব্যাংকের প্রধান কাজ হলো সততা ও দক্ষতার সঙ্গে আমানত সংগ্রহ করা, যোগ্য উদ্যোক্তাকে ঋণ দেওয়া এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন নিশ্চিত করা। বছরের পর বছর মামলা ও ঋণ উদ্ধারের জটিলতায় বিপুল অর্থ আটকে থাকার ফলে ব্যাংকগুলোর কার্যকর ঋণ বিতরণ সক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের তরুণ ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘Distressed Asset Management Company Act, 2026’ প্রণয়নের উদ্যোগ এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (AMC) বা লোন রিকভারি এজেন্সির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার সফল দৃষ্টান্ত রয়েছে। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র যেমন সংকট মোকাবিলায় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিয়েছিল, তেমনি চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড এবং প্রতিবেশী ভারতও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোর মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবিত কাঠামোয় প্রধানত দুটি পথ খোলা যেতে পারে। প্রথমটি হলো ‘অ্যাসেট পারচেজ’ বা ‘ডিসকাউন্ট ক্রয়’ পদ্ধতি। এই ব্যবস্থায় এজেন্সি ব্যাংক থেকে নির্দিষ্ট ডিসকাউন্টে ঋণ কিনে নেবে। যেমন, ১০০ কোটি টাকার একটি খেলাপি ঋণ ৫০ কোটি টাকায় কিনে নেওয়া হতে পারে। এতে ব্যাংকের ব্যালান্সশিট তুলনামূলকভাবে দ্রুত পরিষ্কার হবে এবং নতুন করে ঋণ ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। পরবর্তী সময়ে ওই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ঝুঁকি, দক্ষতা ও আইনি কাঠামোর আওতায় জামানত পুনর্গঠন, বিক্রয় বা প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঋণ উদ্ধারের চেষ্টা করবে।
দ্বিতীয় মডেলটি হতে পারে ‘কমিশনভিত্তিক সেবা’। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের মালিকানা ধরে রাখবে এবং বিশেষায়িত এজেন্সি ঋণ উদ্ধারের কাজ করবে। উদ্ধার করা অর্থের একটি নির্ধারিত অংশ কমিশন হিসেবে এজেন্সিকে দেওয়া হবে। পরিস্থিতি ও ঋণের প্রকৃতি বিবেচনায় উভয় মডেলের সমন্বিত প্রয়োগও বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে যেন কোনো অসাধু বা প্রভাবশালী মহল ব্যাংকের সম্পদ নামমাত্র মূল্যে হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ না পায়, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে। ঋণ বিক্রি, সম্পদ মূল্যায়ন, দরপত্র এবং পুনরুদ্ধার—প্রতিটি ধাপে শতভাগ স্বচ্ছতা ও স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। খেলাপি ঋণের বোঝা কেবল ব্যাংকের ব্যালান্সশিট থেকে সরিয়ে বেসরকারি খাতে স্থানান্তর করাই যেন সংস্কারের উদ্দেশ্য না হয়; বরং প্রকৃত অর্থে ঋণ উদ্ধার এবং সম্পদের সর্বোচ্চ মূল্য নিশ্চিত করাই হতে হবে লক্ষ্য।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, কেবল একটি বিশেষায়িত সংস্থা গঠন করলেই ঋণের পর্বত ধসে পড়বে না, যদি না বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর হয়। বর্তমানে অর্থঋণ আদালতের মামলার দীর্ঘসূত্রতা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের জন্য একধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সুবিধা তৈরি করে দেয়। বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির সুযোগে তারা সম্পত্তি হস্তান্তর, মালিকানা পরিবর্তন কিংবা অর্থ পাচারের সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। তাই অর্থঋণ আদালতের অবকাঠামো আধুনিকায়ন, বিচারকের সংখ্যা ও সহায়ক জনবল বৃদ্ধি, ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি সংশোধন জরুরি।
ঋণ বিতরণের সময় জামানত মূল্যায়নে যে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাও বন্ধ করতে হবে। বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মূল্য দেখিয়ে ঋণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হলে সংশ্লিষ্ট মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতি বা প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া গেলে শুধু ঋণগ্রহীতা নয়, অসৎ ব্যাংকার এবং সংশ্লিষ্ট মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানকেও আইন অনুযায়ী শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
এই পুরো সংস্কার প্রক্রিয়ায় একটি মৌলিক নীতি কঠোরভাবে মেনে চলা প্রয়োজন—ব্যবসায়িক লোকসান এবং ইচ্ছাকৃত প্রতারণা এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক মন্দা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বাজার সংকোচন বা অন্য কোনো অনিবার্য ব্যবসায়িক ধাক্কায় কোনো উদ্যোক্তা সাময়িকভাবে ব্যর্থ হলে তাকে টিকে থাকার জন্য পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল বা প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু যারা শুরু থেকেই ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে বিদেশে পাচার, ভুয়া কাগজপত্র দাখিল কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ঋণ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়েছে, তাদের ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এর বিপরীতে, যারা সততার সঙ্গে নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে আসছেন, সেই সৎ ঋণগ্রহীতাদের উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া আবশ্যক। সুদের হারে বিশেষ ছাড়, দ্রুত ঋণ অনুমোদন এবং ক্রেডিট সুবিধা বাড়ানোর মতো উদ্যোগ নেওয়া হলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার আগ্রহ বাড়বে। এতে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশও তৈরি হবে।
সর্বোপরি, ব্যাংকের সার্বিক গভর্ন্যান্স বা সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া যেকোনো উদ্যোগই ব্যর্থ হতে বাধ্য। রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ বিতরণ বন্ধ করা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বার্থের সংঘাত দূর করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন ও কার্যকর তদারকি ক্ষমতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। দেশের আমানতকারীদের কষ্টার্জিত অর্থ যেন কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার—এই তিনটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ব্যাংকিং খাত দুর্বল হলে বিনিয়োগ কমবে; বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে; উৎপাদন কমলে শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আহরণও কমে যাবে। ফলে ব্যাংকিং খাতের সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন আর্থিক সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করে।
এ কারণে আইএমএফের কঠোর বার্তাকে কেবল ভয় বা চাপ হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটিকে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম ও কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। তবে সংস্কার হতে হবে বাস্তবভিত্তিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি।
ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পর্বত কমাতে এখন আর কোনো কাগুজে বা কসমেটিক সংস্কারে কাজ হবে না; প্রয়োজন গভীর ও সাহসী অস্ত্রোপচার। সেই অস্ত্রোপচারে একদিকে যেমন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকার ও অনিয়মে জড়িত মূল্যায়নকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, অন্যদিকে সৎ উদ্যোক্তা ও নিয়মিত ঋণগ্রহীতাদের জন্য তৈরি করতে হবে নিরাপদ ও প্রণোদনামূলক পরিবেশ।
সুশাসন, আইনের কঠোর প্রয়োগ, কার্যকর বিচারব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক যুক্তির ওপর ভিত্তি করে এই সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারলে ব্যাংকিং খাত আবারও দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই পুনরুদ্ধারের পথে নিতে হলে তাই এখন আর সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই। খেলাপি ঋণের পর্বত ভাঙতেই হবে—আর সেই পথে সাহসী ব্যাংকিং সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com