বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যে কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত সাফল্যের কথা বলা হয়, তার মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি অন্যতম। দারিদ্র্য, সীমিত ভূমি, ঘনবসতি ও সীমাবদ্ধ সম্পদের দেশ হয়েও বাংলাদেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, যা বহু উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনুসরণীয় মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু আজ সেই সাফল্যের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে উঠছে।
মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের স্থবিরতা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট, জনবল ঘাটতি এবং নীতিনির্ধারণী উদাসীনতার কারণে দেশের মোট প্রজনন হার (Total Fertility Rate-TFR) আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এটি নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা।
ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) অনুযায়ী, দেশের মোট প্রজনন হার এখন ২.৪। অর্থাৎ একজন নারী তাঁর প্রজনন জীবনে গড়ে ২.৪টি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। অনেকের কাছে ২.৩ থেকে ২.৪-এ উন্নীত হওয়াকে সামান্য পরিবর্তন মনে হতে পারে। কিন্তু জনমিতির বিজ্ঞান বলছে, এই দশমিক ০.১ বৃদ্ধিই আগামী এক দশকে কয়েক মিলিয়ন অতিরিক্ত মানুষের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সহজ করে বললে, আগে প্রতি ১০ জন মা যেখানে ২৩টি সন্তানের জন্ম দিতেন, এখন সেখানে জন্ম দিচ্ছেন ২৪টি। সংখ্যাটি ছোট হলেও এর সামষ্টিক প্রভাব বিশাল।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার কোটি প্রজননক্ষম নারী রয়েছেন। এই বাস্তবতায় প্রজনন হারের সামান্য বৃদ্ধিও ভবিষ্যৎ জনসংখ্যাকে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, টিএফআর ২.৩ থাকলে ২০৩১ সালে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি ৮০ লাখ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে একই সময়ে জনসংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি ৩৮ লাখে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় ৫৮ লাখ অতিরিক্ত মানুষের জন্য খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, পানি ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। ২০৩৬ সালে এই অতিরিক্ত চাপ প্রায় এক কোটির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এটি নিঃসন্দেহে উন্নয়নের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতা বুঝতে ইতিহাসের দিকে তাকানো প্রয়োজন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ। সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ। অর্থাৎ জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশই ছিল বড়। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেই জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে উন্নয়নের প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি, বাড়ি বাড়ি সেবা, নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের তৎপরতা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে ১৯৭৫ সালের প্রায় ৬.৩ টিএফআর কমে ২০১১ সালে ২.৩-এ নেমে আসে। এই অর্জনের ফলেই বাংলাদেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পাকিস্তানকে অনেক ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।
আজ দুই দেশের জনমিতিক বাস্তবতা আবার নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বর্তমানে পাকিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় ২৫ কোটিরও বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশের সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রাক্কলন অনুযায়ী প্রকৃত জনসংখ্যা প্রায় ১৭ থেকে সাড়ে ১৭ কোটির মধ্যে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সাফল্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু সেই অর্জন যদি ধরে রাখা না যায়, তাহলে আগামী দুই দশকে বাংলাদেশও জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপের কারণে উন্নয়নের গতি হারাতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন হলো? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম গত এক দশকে কার্যত অবহেলার শিকার হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অনুমোদিত ৫৪ হাজার ২২৫টি পদের মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার ৫৫০টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ২৭ শতাংশ পদে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই। অনেক জেলায় অর্ধেকের বেশি পদ খালি। ফলে যে পরিবারকল্যাণ সহকারীরা একসময় নিয়মিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবরাহ করতেন এবং দম্পতিদের পরামর্শ দিতেন, তাঁদের উপস্থিতি এখন অত্যন্ত সীমিত। কোথাও পাঁচজনের কাজ করছেন একজন। ফলে আগে দুই মাস পরপর যে পরিবারে সেবা পৌঁছাত, এখন সেখানে আবার যেতে প্রায় নয় মাস সময় লেগে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ বিরতিতে নতুন দম্পতি, কিশোরী মা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ নারীরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ভয়াবহ সংকট। সরকারি গুদামে মুখে খাওয়ার বড়ি, আইইউডি, ইমপ্ল্যান্টসহ বিভিন্ন আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির পর্যাপ্ত মজুত নেই। আগে সরকার যে সামগ্রী প্রায় বিনামূল্যে সরবরাহ করত, এখন তা কিনতে সাধারণ মানুষকে বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কনডম, পিল বা অন্যান্য সামগ্রী কিনতে ২৫ টাকা থেকে শুরু করে কয়েকশ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে নিম্নআয়ের মানুষের পক্ষে নিয়মিত এসব সামগ্রী কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলাফলও স্পষ্ট। দেশে সক্ষম দম্পতিদের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহারের হার (Contraceptive Prevalence Rate) ২০১৯ সালের ৬২.৭ শতাংশ থেকে নেমে ২০২৫ সালে ৫৮.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে অপূর্ণ চাহিদার হার বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি আগের গুরুত্ব হারিয়েছে। একসময় “ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট” কিংবা “দুটি সন্তানের বেশি নয়”—এই ধরনের স্লোগান জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই জনসচেতনতা কার্যক্রম কার্যত স্তব্ধ। জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদের সভাও দীর্ঘ সময় নিয়মিত হয়নি। এমনকি ২০২৫-২০৩০ সালের জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশলপত্রেও টিএফআর ২.১-এ নামিয়ে আনার মতো স্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অনুপস্থিত। এটি উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ বর্তমানে এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১,৩০০ জনের বেশি মানুষের বসবাস বিশ্বের সর্বোচ্চ ঘনত্বের অন্যতম। কৃষিজমি ক্রমাগত কমছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে, শহরমুখী জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কর্মসংস্থানের চাপ বাড়ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি উন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত করবে।
এটি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। ঘন ঘন গর্ভধারণ মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়, রক্তস্বল্পতা, অপুষ্টি, জরায়ুর জটিলতা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যা সৃষ্টি করে। অপুষ্ট মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায় এবং ভবিষ্যতে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকিতে থাকে। একই সঙ্গে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) অর্জনের পরিবর্তে দেশ জনমিতিক বোঝার (Demographic Burden) দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখনো সুযোগ রয়েছে। এজন্য পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে জাতীয় অগ্রাধিকারে ফিরিয়ে আনতে হবে। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করতে হবে। মাঠপর্যায়ের পরিবারকল্যাণ সহকারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা জোরদার করতে হবে। গণমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে নতুন করে জাতীয় জনসচেতনতা কর্মসূচি শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশলপত্রে সুস্পষ্টভাবে প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন হার ২.১ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। কিন্তু এই সমস্ত অর্জনের ভিত্তি টেকসই রাখতে হলে জনসংখ্যা ও সম্পদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য। সীমিত ভূখণ্ডে অসীম জনসংখ্যার চাপ কোনো উন্নয়নকেই দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয় না। অতীতের সাফল্যের স্মৃতি নয়, ভবিষ্যতের নিরাপত্তাই এখন সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়। তাই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে আর অবহেলার সুযোগ নেই। আজ যে সতর্ক সংকেত দৃশ্যমান, তা যদি সময়মতো গুরুত্ব না পায়, তাহলে আগামী প্রজন্মকে তার মূল্য দিতে হবে খাদ্যসংকট, বেকারত্ব, পরিবেশ বিপর্যয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক অস্থিরতার মাধ্যমে। জনমিতির এই অশনিসংকেতকে উপেক্ষা করার সুযোগ বাংলাদেশের আর নেই।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।