বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিন সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই সময়টিকে ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা যেমন তুঙ্গে থাকে, তেমনি সরকারের জন্যও এটি হয়ে ওঠে নিজেদের অঙ্গীকার, রাজনৈতিক দর্শন ও প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রমাণের প্রথম বড় পরীক্ষা। বর্তমান সরকারের ‘১০০ দিন পূর্তি’ উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা কেবল একটি সরকারের প্রাথমিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ নয়; বরং এটি রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন গতি, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান শপথ গ্রহণের পর থেকেই সরকার প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে কার্যকর পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৮০ দিনের খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের যে রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে, তা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ বলেই বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, বিগত ১৬ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সেবাকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এই কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে।
প্রথম ১০০ দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনিক গতিশীলতা। সরকার গঠনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মাত্র কয়েক মাসে ১০টি মন্ত্রিসভা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে গৃহীত ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মধ্যে ৩৭টি ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৬২ শতাংশ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় এটি নিঃসন্দেহে একটি দ্রুত কর্মসম্পাদনের ইঙ্গিত বহন করে।
অর্থনীতি ও জনস্বস্তির প্রশ্নে ও সরকার শুরু থেকেই কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ডলারের চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজার অস্থিরতার মধ্যে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই ছিল সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় বাজার তদারকি বৃদ্ধি, টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণ, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহারের মতো সিদ্ধান্ত জনস্বস্তির বার্তা দিয়েছে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার সিদ্ধান্তটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় সেবাকে আরও স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক করার ইঙ্গিত দেয়। নিম্নআয়ের ৫৫ লাখ পরিবারকে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ অব্যাহত রাখা সরকারের সামাজিক দায়বদ্ধতার আরেকটি উদাহরণ।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর ঐতিহাসিক ‘খাল খনন কর্মসূচি’ পুনরায় চালুর ঘোষণা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার হলে কৃষি, মৎস্য, সেচব্যবস্থা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষায় ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ বাস্তবায়নের ঘোষণাও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সরকারের প্রথম ১০০ দিনের আরেকটি আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ পুনর্বহাল। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে বাদ দেওয়া এই শব্দবন্ধ পুনঃসংযোজনকে সরকার জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন হিসেবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ জব্দের পদক্ষেপ দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের একটি শক্ত বার্তা হিসেবে আলোচনায় এসেছে। অর্থনৈতিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকিং সংস্কার ও আর্থিক খাত পুনর্গঠনের উদ্যোগের কথাও সরকার বলছে।
অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণার বিষয়টি ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ২ লাখ ফ্রিল্যান্সারকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র প্রদান এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ‘স্টার্ট-আপ ফান্ড’ চালুর উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের ডিজিটাল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে।
রেমিট্যান্স প্রবাহেও সরকারের প্রতি আস্থার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। গত মাসে দেশে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা একটি রেকর্ড। প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ তাদের রাষ্ট্রীয় সেবার আওতায় আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সরকারের সক্রিয়তা লক্ষণীয়। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের জন্য সম্মানী চালু, নারীদের জন্য ভর্তুকিসহ ‘এলপিজি কার্ড’, শ্রমিকদের ঈদ বোনাস নিশ্চিতে নগদ অর্থছাড় এবং সাধারণ হজযাত্রীদের বিমানভাড়া কমানোর উদ্যোগ সরকারকে জনমুখী ভাবমূর্তি দিতে সহায়তা করেছে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সরকার কিছু দ্রুত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছে। মেহেরপুরে ৯ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের মামলায় মাত্র ২৯ কার্যদিবসে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান দেশের বিচারব্যবস্থায় দ্রুত বিচারের একটি নজির হিসেবে আলোচিত হয়েছে। দীর্ঘদিন আলোচিত তনু হত্যা মামলার প্রথম আসামি গ্রেফতার, শিশু রামিসা হত্যা মামলায় দ্রুত চার্জশিট এবং শরিফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার আসামিকে ভারতে শনাক্ত করার মতো ঘটনাগুলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার প্রচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতেও প্রথম ১০০ দিনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এসেছে। অনার্স পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার সিদ্ধান্ত নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আগামী জুলাই থেকে প্রতিটি উপজেলায় শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেস, জুতা ও পাটের ব্যাগ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনাও ইতিবাচক। বিমানবন্দর ও ট্রেনে হাই-স্পিড ফ্রি ওয়াই-ফাই এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্মার্ট ক্লাসরুম সম্প্রসারণ ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাকে আরও বাস্তবভিত্তিক করতে পারে।
যুব উন্নয়ন ও ক্রীড়া খাতেও সরকার নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রতিটি জেলায় ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর উদ্যোগ, ‘ক্রীড়া কার্ড’ প্রবর্তন এবং ৬৪ জেলায় ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ নির্মাণের পরিকল্পনা তরুণদের সম্পৃক্ততার নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। একই সঙ্গে আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সরকারের মনোযোগের প্রতিফলন।
সংসদীয় কার্যক্রমেও সরকার একটি নতুন বার্তা দিতে চেয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ২৫ কার্যদিবসে ৯৪টি বিল পাস এবং দ্রুততম সময়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনকে সংসদীয় কার্যকারিতার দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে সংসদের তৃতীয় সারিতে বসে সংসদীয় রীতিনীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন—এমন প্রতীকী পদক্ষেপও রাজনৈতিক আলোচনায় স্থান পেয়েছে।
পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনায় সরকারের পরিকল্পনাও বেশ উচ্চাভিলাষী। ‘গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন ঢাকা’ মহাপরিকল্পনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ২৫০টি বৈদ্যুতিক বাস চালু এবং ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয়। প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য মেট্রোরেল ও ট্রেনে ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড় কার্যকর করার সিদ্ধান্তও প্রশংসিত হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সরকার আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। অত্যাধুনিক ‘গ্রাউন্ড মাস্টার-৪০০’ রাডার চালুর মাধ্যমে দেশের আকাশসীমা ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে নজরদারি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এটি শুধু নিরাপত্তা নয়, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ফ্লাইং ওভার চার্জ থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগও সৃষ্টি করবে।
তবে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রম মূল্যায়নে শুধু ঘোষণা বা সংখ্যার হিসাবই যথেষ্ট নয়; বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ। এখনও দ্রব্যমূল্যের চাপ পুরোপুরি কমেনি, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম রয়ে গেছে, বেকারত্ব বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই আছে। ফলে সরকারের সামনে পথ মোটেও সহজ নয়।
তবুও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমান সরকার প্রথম ১০০ দিনেই একটি সক্রিয়, দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণকারী এবং রাজনৈতিকভাবে আত্মবিশ্বাসী প্রশাসনের চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। তাই এটিকে ভবিষ্যৎ সফলতার ভিত্তি নির্মাণের প্রাথমিক ধাপ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।জনগণের প্রত্যাশা এখন—এই গতি যেন শুধু সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং বাস্তব জীবনের পরিবর্তনে প্রতিফলিত হয়।
কারণ জনগণ এখন কেবল উন্নয়নের স্লোগান নয়, উন্নয়নের বাস্তব ফল দেখতে চায়। তারা চায় কর্মসংস্থান, বাজারে স্বস্তি, সুশাসন এবং নিরাপদ জীবন। সরকারের শত দিনের যাত্রা সেই দীর্ঘ অভিযাত্রার সূচনা মাত্র। এখন দেখার বিষয়—এই সূচনা কতটা টেকসই উন্নয়ন, গণমানুষের আস্থা এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতায় রূপ নিতে পারে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com