লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অর্থনীতিতে উন্নীত করার যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক নতুন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এমন লক্ষ্য কেবল পরিসংখ্যানগত নয়; এটি অর্থনৈতিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নতুন অবস্থান অর্জনের অঙ্গীকারও বটে। কিন্তু অর্থনীতির ইতিহাস বলছে, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা যত সহজ, তার বাস্তবায়ন ততটাই কঠিন। অর্থনৈতিক বাস্তবতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের ভিত্তি শক্তিশালী না হলে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কেবল বাজেট বক্তৃতার অলংকার হয়েই থেকে যাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৫০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ আগামী আট থেকে নয় বছরের মধ্যে অর্থনীতিকে প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কেবল উচ্চ প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; প্রবৃদ্ধির গুণগত মান, উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি, বিনিয়োগের সম্প্রসারণ, রপ্তানির বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, যদি মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় থাকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ৬ থেকে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি টাকার অবমূল্যায়ন অব্যাহত থাকে, বিনিয়োগ স্থবির থাকে এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়, তাহলে ৮ থেকে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
অর্থনীতির মৌলিক তত্ত্ব বলছে, প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে থাকে বিনিয়োগ। বিনিয়োগ ছাড়া উৎপাদন বাড়ে না, উৎপাদন না বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না, কর্মসংস্থান না হলে আয় বাড়ে না, আর আয় না বাড়লে ভোগ, সঞ্চয় ও মূলধন গঠনের চক্রও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশে বিনিয়োগের বাস্তব চিত্র কী?
দেশে দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির তুলনায় কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাড়ছে না। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, শিল্পে জ্বালানির অনিশ্চয়তা, ডলার সংকট, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতা নতুন উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। একদিকে সরকার অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করছে, অন্যদিকে উৎপাদনমুখী বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না। এই বৈপরীত্য দূর না করতে পারলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
বাংলাদেশের শিল্পায়ন কৌশলও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। বহু বছর ধরে বৃহৎ শিল্পকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির ধারণা অর্থনৈতিক নীতিতে প্রাধান্য পেয়েছে। বৃহৎ শিল্প নিঃসন্দেহে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করে, প্রযুক্তি স্থানান্তর ঘটায় এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তবে বাস্তবতা হলো, একটি দেশের সর্বাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (CMSME)। বাংলাদেশের প্রায় সব অর্থনৈতিক অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পই স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তুলনামূলকভাবে কম মূলধন, দ্রুত উৎপাদন শুরু করার সক্ষমতা এবং স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ এই খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
বিশ্বের অনেক সফল অর্থনীতির অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জার্মানির ‘মিটেলস্ট্যান্ড’, জাপানের ক্ষুদ্র উৎপাদন নেটওয়ার্ক, দক্ষিণ কোরিয়ার উপকরণ শিল্প কিংবা চীনের আঞ্চলিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পই বৃহৎ শিল্পায়নের ভিত্তি নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। বৃহৎ শিল্প ও CMSME—এই দুই খাতকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বড় শিল্প হবে প্রযুক্তি ও মূলধনের চালিকাশক্তি, আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প হবে কর্মসংস্থান, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি।
এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) একটি অপরিহার্য উপাদান। বাংলাদেশের মতো মূলধন-স্বল্প দেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ কেবল অর্থ নয়; এটি উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিরও অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ এখনও সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ এখনও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে রয়েছে। এর প্রধান কারণ নীতিগত অনিশ্চয়তা, দীর্ঘসূত্রতা, ভূমি ব্যবস্থাপনার জটিলতা, চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা, বন্দর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির ঘাটতি।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনগুলোকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। শুধু বিনিয়োগ আহ্বান করলেই হবে না; বিনিয়োগকারীর আস্থা অর্জন করতে হবে। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রথমেই বিবেচনা করেন—নীতি কতটা স্থিতিশীল, বিচারব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কতটা যৌক্তিক।
অন্যদিকে দেশের ব্যাংকিং খাত আজও অন্যতম বড় দুর্বলতা। খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ, মূলধনের ঘাটতি, করপোরেট সুশাসনের সংকট এবং ঋণ বিতরণে অনিয়ম অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একটি দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা কখনোই শক্তিশালী শিল্পায়নের ভিত্তি হতে পারে না। কারণ শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের প্রধান উৎসই হচ্ছে আর্থিক খাত। তাই ব্যাংকিং খাতে কঠোর সংস্কার, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণনীতি এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও এখন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি শুধু মানুষের ক্রয়ক্ষমতাই কমায় না; এটি বিনিয়োগ পরিকল্পনাকেও অনিশ্চিত করে তোলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর সঞ্চয় কমিয়ে দেয়, ফলে অভ্যন্তরীণ মূলধন গঠনও বাধাগ্রস্ত হয়। তাই মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করে মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো রপ্তানির একমুখী নির্ভরতা। এখনও দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ তৈরি পোশাক শিল্প থেকে আসে। অথচ বৈশ্বিক বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা এবং নতুন বাণিজ্য নীতির যুগে শুধুমাত্র একটি খাতের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক, মেডিকেল সরঞ্জাম এবং সবুজ প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পকে নতুন রপ্তানি খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধা বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড দীর্ঘদিন থাকবে না। এই সময়কে কাজে লাগাতে না পারলে আগামী দশকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীই অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ হয়ে দাঁড়াবে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্মমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং শিল্পের চাহিদাভিত্তিক করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি, উপকূলীয় অর্থনীতি এবং অবকাঠামো জলবায়ু ঝুঁকির মুখে। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ শিল্পায়ন এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য। ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘গ্রিন গ্রোথ’ কেবল পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিরও পূর্বশর্ত।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কোনো জাদুকরী সংখ্যা নয়। এটি অর্জনের অর্থ হলো—একটি শক্তিশালী উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি, সুশাসনসম্পন্ন আর্থিক ব্যবস্থা, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রতিযোগিতামূলক শিল্প, আধুনিক কৃষি, শক্তিশালী রপ্তানি এবং বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। প্রবৃদ্ধির সুফল যদি কেবল কয়েকটি খাত বা সীমিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি কখনোই টেকসই হবে না।
বাংলাদেশের সামনে সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও কম নয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, নীতির ধারাবাহিকতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের সংস্কার, ব্যবসা সহজীকরণ, CMSME খাতের বিকাশ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের সমন্বিত বাস্তবায়নই পারে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিতে। অন্যথায় এই লক্ষ্য কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে। এখন সময় এসেছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ঘোষণার নয়, বরং সাহসী সংস্কার, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক শাসনের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, উৎপাদনশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণ করার।