• মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৫ অপরাহ্ন

অপবাদের রাজনীতি: রাজনীতিতে অপবাদ বন্ধ হোক

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া ও রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক। / ৫৪ দেখেছেন
আপলোড : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) আলোকপাতে বর্তমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের দিকে তাকালে একটি ভয়াবহ ব্যাধি পরিলক্ষিত হয়—তা হলো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য নৈতিকতার চরম বিসর্জন। রাজনীতি যেখানে হওয়ার কথা ছিল জনকল্যাণ ও আদর্শের প্রতিযোগিতা, সেখানে তা রূপ নিয়েছে চরিত্র হনন (Character Assassination) এবং কাদা ছোঁড়াছুড়ির নোংরা খেলায়। কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার সমালোচনা করা কিংবা সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে কেবল অনুমানের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার যে অপকৌশল, তা মূলত সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। ইসলামি শরিয়তের শাশ্বত বিধান এবং অপরাধবিজ্ঞানের সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের (Sociological Theories of Crime) মেলবন্ধনে বিচার করলে দেখা যায়, ‘গীবত’ (পরনিন্দা) ও ‘বুহতান’ (অপবাদ) কেবল ব্যক্তিগত পাপাচার নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত সামাজিক অপরাধ, যা বর্তমান ‘অপবাদের রাজনীতি’র মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

গীবত বা পরনিন্দা: রাজনৈতিক চরিত্র হননের হাতিয়ার

ইসলামি পরিভাষায়, কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো সত্য দোষত্রুটি নিয়ে আলোচনা করা যা শুনলে সে মনে কষ্ট পায়, তা-ই গীবত। রাজনৈতিক মঞ্চে প্রতিপক্ষের বাস্তব কোনো দুর্বলতাকে অতিরঞ্জিত করে জনসমক্ষে উপস্থাপন করা এই পরনিন্দারই নামান্তর।

ঐশী প্রজ্ঞার আলোকে (কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি): মানব মর্যাদার সুরক্ষায় পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা গীবতকে এক জঘন্য মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক বিকৃতির সাথে তুলনা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে:

“তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তা অপছন্দই করো।” (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২)

অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, একজন জীবিত মানুষের অনুপস্থিতিতে তার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা তাকে মানসিকভাবে হত্যা করার শামিল। পবিত্র কুরআন একেই ‘মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া’র সমতুল্য বলে এর ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (হাদিসের দৃষ্টিভঙ্গি): রাসূলুল্লাহ (সা.) গীবতের যে প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য এক অনন্য দিকনির্দেশনা। তিনি বলেছেন:

“তুমি তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কথা বলবে যা সে অপছন্দ করে।” জিজ্ঞেস করা হলো, “আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সত্যিই থাকে?” রাসূল (সা.) বললেন, “তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবেই তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তা না থাকে, তবে তুমি তাকে অপবাদ দিলে।” (সহীহ মুসলিম)

বুহতান বা অপবাদ: সত্য-মিথ্যা না জেনে সমালোচনা ও প্রোপাগান্ডা

রাজনীতিতে সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাধি হলো ‘পোস্ট-ট্রুথ’ (Post-Truth) বা সত্যোত্তর যুগের প্রোপাগান্ডা, যেখানে সত্যের চেয়ে আবেগকে উস্কে দেওয়া এবং মিথ্যাকে বারবার বলে সত্যে রূপান্তরের চেষ্টা করা হয়। ইসলাম একে ‘বুহতান’ বা অপবাদ বলে অভিহিত করেছে।

তথ্যায়ন ও যাচাইকরণের অপরিহার্যতা (কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি): কোনো বিষয়ের সত্যতা না জেনে স্রেফ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোকে পবিত্র কুরআন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে:

“যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পোড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৬)

তথ্যের সত্যতা যাচাই বা ‘Fact-Checking’ এর আধুনিক ধারণার ভিত্তি মূলত ইসলামের এই নীতি। সূরা হুজুরাতে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় তথ্যের উৎস অনুসন্ধানের তাগিদ দিয়ে বলা হয়েছে:

“হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে (সত্য-মিথ্যা যাচাই করবে)। যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে না হয়।” (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৬)

অনুমানভিত্তিক রাজনীতির অবসান (হাদিসের দৃষ্টিভঙ্গি): অনুমানের ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক বয়ান (Narrative) তৈরি করার বৈশ্বিক যে ট্রেন্ড, তার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“তোমরা অনুমান থেকে বেঁচে থাকো। কারণ অনুমান হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা।” (সহীহ বুখারী)

সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমের অপব্যবহারের এই যুগে যেকোনো শোনা কথা ছড়ানোর প্রবণতাকে অপরাধের স্তরে উন্নীত করে তিনি আরও বলেছেন:

“কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করে) তা-ই বর্ণনা করে বেড়ায়।” (সহীহ মুসলিম)

অপরিচিত ও দূরবর্তী নাগরিকের অধিকার হরণ: অপরাধবৈজ্ঞানিক সংকট

অপবাদের রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিকার হন সাধারণ নাগরিক কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, যাদের সাথে ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগের কোনো সুযোগ থাকে না। ইসলামি মানবাধিকার সনদে একজন মানুষের সম্মান ও রক্তকে সর্বোচ্চ পবিত্রতা দেওয়া হয়েছে। অপরিচিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই অপরাধের মাত্রা বহুগুণ জটিল হয়ে ওঠে, যা অপরাধবিজ্ঞানের ‘ভিকটিমোলজি’ (Victimology) শাখার অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়।

প্রতিকারহীন সামাজিক অপরাধ: পরিচিত কারো অধিকার ক্ষুণ্ন করলে সামাজিক বা ব্যক্তিগতভাবে ‘হক’ মাফ করিয়ে নেওয়ার বা মীমাংসার (Restorative Justice) সুযোগ থাকে।

অনন্তকালীন দায়বদ্ধতা: কিন্তু সামাজিকভাবে বা গণমাধ্যমে কোনো অপরিচিত বা দূরবর্তী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ালে, পরবর্তীতে তার কাছে সশরীরে ক্ষমা চাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে এই ‘বান্দার হক’ (Human Rights) লঙ্ঘনের অপরাধটি অপরিবর্তনীয় (Irreversible) সামাজিক ক্ষতিতে রূপ নেয়, যা পরকালে কঠিনতম শাস্তির কারণ হবে।

অপরাধতাত্ত্বিক সারসংক্ষেপ (Criminological Synthesis)

একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গঠনে ‘অপবাদের রাজনীতি’ একটি ক্যানসার। ইসলামি শরিয়ত ও অপরাধবিজ্ঞানের সমন্বিত বিশ্লেষণে এই প্রবণতাটি মূলত চারটি বড় অপরাধের একটি চক্রাকার সমষ্টি (Complex of Offenses):

১. গীবত (Backbiting) ➔ অনুপস্থিত ব্যক্তির চরিত্র হনন ও সামাজিক মর্যাদা বিনষ্ট করা।
২. বুহতান (Slander) ➔ সত্যতা যাচাই ছাড়া মিথ্যা অপবাদ ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানো।
৩. সাডমাজিক বিশৃঙ্খলা (Fitnah) ➔ সমাজের শান্তি, সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করা।
৪. মানবাধিকার লঙ্ঘন (Violation)➔ বান্দার হক নষ্ট করা, যা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমা ছাড়া অপরিবর্তনযোগ্য।

উত্তরণের পথ

রাজনীতি হোক আদর্শের, কাদা ছোঁড়াছুড়ির নয়। পরকালের জবাবদিহিতা এবং ইহকালের সামাজিক শান্তি—উভয় সংকটের হাত থেকে বাঁচতে হলে এই নোংরা সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপবাদ বা গীবতের পাপ সংঘটিত হয়ে গেলে, তার থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর যদি বাস্তব পরিস্থিতির কারণে তা অসম্ভব হয়, তবে আল্লাহর দরবারে খাঁটি চিত্তে তওবা (Repentance) করতে হবে এবং ওই ব্যক্তির সামাজিক সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য প্রকাশ্যে সত্য প্রকাশ করতে হবে, পাশাপাশি তার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করতে হবে।

একটি সুস্থ, সভ্য ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণে এবং সুস্থ ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চায় আমাদের এখনই বলতে হবে—”রাজনীতিতে অপবাদ ও চরিত্র হনন বন্ধ হোক।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..