পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য জীবনরক্ষাকারী স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য ও ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পের অবহিতকরণ সভা রোববার (২ আগস্ট) খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা পরিষদের সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাবারাং কল্যাণ সমিতির আয়োজনে বিকাল ২টায় শুরু হওয়া সভায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়, তথ্য বিনিময় ও যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
“Access to and Utilization of Lifesaving Services by Marginalized Communities in Chittagong Hill Tracts in Bangladesh” শীর্ষক প্রকল্পটি হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় খাগড়াছড়ি জেলার নয়টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করছে জাবারাং কল্যাণ সমিতি।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারিয়া সুলতানা বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নের জন্য সরকারি দপ্তর, বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান ও পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি কমবে, সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং সেবা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিতভাবে কাজ করার বিকল্প নেই এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি বিভাগ ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অংশীদারিত্ব যত শক্তিশালী হবে, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা ততই সহজ হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূসরাত জাবীন।
শুরুতে প্রকল্প পরিচালক বিনোদন ত্রিপুরা অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়ন কৌশল সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দেন। দীঘিনালা উপজেলা কোঅর্ডিনেটর মিহির কান্তি ত্রিপুরার সঞ্চালনায় পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় প্রকল্পের কার্যক্রম, বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও প্রত্যাশিত ফলাফল বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এছাড়া খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা কোঅর্ডিনেটর নির্নিতা খীসা সংস্থাটির দীর্ঘদিনের কার্যক্রম ও পার্বত্য অঞ্চলে স্বাস্থ্য-পুষ্টি খাতে কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রকল্প পরিচালক বিনোদন ত্রিপুরা জানান, জিপিএস-ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রায় দুই মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪৭ হাজার ৯২২ শিশুর মিড-আপার আর্ম সার্কামফারেন্স (MUAC) স্ক্রিনিং সম্পন্ন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে অপুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কোনো এলাকা বা পরিবারের শিশু এখনো এই স্ক্রিনিংয়ের বাইরে থাকলে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানোর অনুরোধ জানান তিনি।
সভায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও উন্নয়নকর্মীরা প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত MUAC স্ক্রিনিং কার্যক্রম, তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া এবং সীমিত জনবল নিয়ে দুর্গম এলাকায় কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন ও মতামত তুলে ধরেন। তাঁরা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের পরামর্শ দেন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুস্মিতা খীসা, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তনয় তালুকদার, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভেটেরিনারি সার্জন) ডা. ওমর ফারুক, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুক্তা চাকমা, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নিটু দেওয়ান, ভাইবোনছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুজন চাকমা, হেডম্যান জ্ঞানলাল দেওয়ান ও উক্যসাইন চৌধুরীসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, হেডম্যান, কার্বারি ও কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা।
সভায় বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ও স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রকল্পটি পার্বত্য অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।