হেডলাইন:
থানচি কলেজে এইচএসসির ফলাফলে ধস, শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতা নিয়ে অভিভাবকদের তীব্র ক্ষোভ দীঘিনালার তিন কলেজে এইচএসসির ফল বিপর্যয়, পাসের হার ১৫–২৪ শতাংশ দুপচাঁচিয়ায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা: ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে শিক্ষিকার মৃত্যু, আহত স্বামী আজ এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ এর ফল প্রকাশ, অপেক্ষায় ১২ লাখ শিক্ষার্থী শুঁটকি মৌসুমের শুরুতেই দুর্যোগের থাবা, বিপাকে দুবলার হাজারো জেলে সাজেক সড়কে রবিবার ১২ ঘণ্টার জন্য শিথিল হচ্ছে অবরোধ, সোমবার থেকে ফের কর্মসূচি জামায়াতে ইসলামীর কর্মী শিক্ষার বৈঠক অনুষ্ঠিত গোপালগঞ্জে বিনা ধান-২৬ চাষে বাম্পার ফলন: সাফল্যের গল্প আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের সাথে চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবদলের সৌজন্য সাক্ষাৎ মান্দায় যুব জামায়াতের আন্তঃইউনিয়ন ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত

থানচি কলেজে এইচএসসির ফলাফলে ধস, শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতা নিয়ে অভিভাবকদের তীব্র ক্ষোভ

উশৈনু মারমা, থানচি, প্রতিনিধি বান্দরবান / ৫০ দেখেছেন
আপলোড : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা থানচির একমাত্র উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থানচি কলেজে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে। ৫৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ১৩ জন। পাসের হার মাত্র ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেননি একজন শিক্ষার্থীও। শিক্ষার এমন করুণ চিত্রে প্রতিষ্ঠানটির পাঠদানব্যবস্থা, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা ও প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা এ ফলাফলকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে নারাজ; তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা ও নিয়মিত পাঠদানের ঘাটতিই এমন বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে কলেজের অধ্যক্ষ ধমিনিক ত্রিপুরা ফলাফলের তথ্য নিশ্চিত করেন। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি জনপদের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রধান ভরসা হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানের এমন ফলাফল স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নগ্নভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কষ্টার্জিত অর্থ এবং দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা থাকা সত্ত্বেও একটি কলেজে ন্যূনতম মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন? শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই দায়হীনতার জবাব কে দেবে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবকের অভিযোগ, কলেজে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি যথাযথ মনোযোগ নিশ্চিত হচ্ছে না। তাঁদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা যদি নিয়মিত ক্লাস না নেন এবং নির্ধারিত পাঠ্যসূচি যথাসময়ে শেষ না করেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করা অবাস্তব। পরীক্ষার আগে কিছু পরামর্শ দিয়ে কিংবা ফলাফল প্রকাশের পর নীরব থেকে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। শিক্ষার মান ধসে পড়লে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

একাধিক অভিভাবক বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার্থীরা নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। অনেক দরিদ্র পরিবার কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে সন্তানদের কলেজে পাঠায়। কিন্তু একমাত্র ভরসার প্রতিষ্ঠানেই যদি মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত না হয়, তাহলে এসব শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক দুর্বল ফলাফল কখনোই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।

সন্তানের ফলাফল বিপর্যয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিটক্রে ইয়াংব পাড়ার বাসিন্দা দনরয় ম্রো বলেন, ‘আমরা সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কলেজে পাঠাই। কিন্তু শিক্ষক যদি নিয়মিত ক্লাসে না আসেন, দায়িত্ব নিয়ে পাঠদান না করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা শিখবে কীভাবে? শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন অবহেলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

আরও পড়ুন  বুড়িচংয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে সেমিনার ও পুরস্কার বিতরণ

কলেজের অধ্যক্ষ ধমিনিক ত্রিপুরার দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৯ সালে কলেজ প্রতিষ্ঠার পর প্রথম এইচএসসি পরীক্ষায় ২২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৩ জন উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে ফলাফলে উন্নতি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফলাফলের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অধ্যক্ষের তথ্যানুযায়ী, এর আগের এক বছরে পাসের হার ছিল ৭৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ছিল ৬১ দশমিক ০৯ শতাংশ। অথচ ২০২৬ সালে তা এক ধাক্কায় নেমে এসেছে ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশে।

চলতি বছর কলেজ থেকে ৫৪ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষার জন্য নিবন্ধিত হন। তাঁদের মধ্যে একজন পরীক্ষায় অংশ নেননি। ফলে পরীক্ষায় অংশ নেন ৫৩ জন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় চারজনের মধ্যে তিনজনই অকৃতকার্য হয়েছেন। এমন ফলাফলকে বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এর পেছনের কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।

ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ধমিনিক ত্রিপুরা সাংবাদিকদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন বলে জানান। তবে ফলাফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ফলে কলেজের পাঠদান পরিস্থিতি, শিক্ষকদের উপস্থিতি, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অভিভাবকদের দাবি, ফলাফল বিপর্যয়ের দায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পাঠ্যসূচি যথাসময়ে সম্পন্ন করা, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাস এবং নিয়মিত পরীক্ষা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি গত কয়েক বছরের ফলাফল ও কলেজের সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে হবে।

তাঁরা আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু নামসর্বস্ব ভবন কিংবা সনদ দেওয়ার কেন্দ্র হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব যাঁদের ওপর, তাঁদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকলে তার যথাযথ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্গম থানচির শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন রক্ষায় থানচি কলেজের শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। মাত্র ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ পাসের হার শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফল নয়, এটি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম ও তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন এই বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, নাকি পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই উদ্বেগও অবহেলায় চাপা পড়ে যায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..