হেডলাইন:
শুঁটকি মৌসুমের শুরুতেই দুর্যোগের থাবা, বিপাকে দুবলার হাজারো জেলে সাজেক সড়কে রবিবার ১২ ঘণ্টার জন্য শিথিল হচ্ছে অবরোধ, সোমবার থেকে ফের কর্মসূচি জামায়াতে ইসলামীর কর্মী শিক্ষার বৈঠক অনুষ্ঠিত গোপালগঞ্জে বিনা ধান-২৬ চাষে বাম্পার ফলন: সাফল্যের গল্প আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের সাথে চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবদলের সৌজন্য সাক্ষাৎ মান্দায় যুব জামায়াতের আন্তঃইউনিয়ন ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত কুবি বরিশাল ডিভিশনাল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে নয়ন-স্বর্ণা ​রাজশাহীতে ২৮ কেজি গাঁজাসহ এক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার বিজয়ের পর প্রতিদ্বন্দ্বীর বাসায় মির্জা ফয়সল আমীন দীঘিনালায় দুই বৌদ্ধবিহারের কঠিন চীবর দান পরিদর্শনে জোন কমান্ডার, সম্প্রীতির বার্তা।

শুঁটকি মৌসুমের শুরুতেই দুর্যোগের থাবা, বিপাকে দুবলার হাজারো জেলে

ম. ম. রবি ডাকুয়া, বাগেরহাট: / ৪ দেখেছেন
আপলোড : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

  • উত্তাল সাগর ও টানা বৃষ্টিতে ব্যাহত মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন; ঋণ, বিনিয়োগ ও জীবিকা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় জেলেরা।

 

সুন্দরবনের দুবলার চরে শুঁটকি মৌসুম শুরু হতে না হতেই বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়েছেন হাজারো জেলে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস ও উত্তাল সাগরে ব্যাহত হচ্ছে মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন। মৌসুমের শুরুতেই এমন পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তায় পড়েছে উপকূলীয় জেলেদের পাঁচ মাসের জীবিকা। ঋণ ও ধারদেনা করে মাছ ধরার প্রস্তুতি নেওয়া জেলেদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও হতাশা।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে চলতি বছরের শুঁটকি মৌসুম। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই প্রকৃতির বিরূপ আচরণে দুবলার চরের শুঁটকি পল্লিগুলোতে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য ব্যাহত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিপাত শুক্রবারও অব্যাহত থাকায় অনেক জেলে চরে নেমে অস্থায়ী ঘরবাড়ি, মাছ সংরক্ষণের গোলা ও শুঁটকি শুকানোর মাচা তৈরি করতে পারেননি। উত্তাল সাগরের কারণে অনেকেই মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। আবার কেউ কেউ উপকূলের কাছাকাছি থেকে মাছ আহরণ করলেও পর্যাপ্ত রোদের অভাবে তা শুকাতে পারছেন না।

প্রতি বছর অক্টোবরের শেষ দিক থেকে মার্চ পর্যন্ত সুন্দরবনের দুবলার চর, আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শেলারচর এলাকায় শুঁটকি উৎপাদন ঘিরে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলে। এ মৌসুমে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় জেলা থেকে হাজার হাজার জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ সেখানে সমবেত হন। মাছ আহরণ, বাছাই, পরিষ্কার, লবণ মেশানো, শুকানো ও বাজারজাতকরণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

কিন্তু এবার মৌসুমের শুরুতেই বৈরী আবহাওয়া সেই কর্মযজ্ঞে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জেলে নৌকা ও ট্রলার নিয়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছেন। সাগরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

ঋণ করে এসেছেন, লোকসানের শঙ্কায় জেলেরা:

দুবলার চরের জেলেদের কাছে শুঁটকি মৌসুম শুধু মাছ আহরণ কিংবা ব্যবসার সময় নয়; এটি তাঁদের সারা বছরের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। পাঁচ মাসের এই মৌসুমের আয়ের ওপর নির্ভর করে হাজারো জেলে পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, সন্তানদের লেখাপড়া ও দৈনন্দিন ব্যয়।

অনেক জেলে মহাজনদের কাছ থেকে দাদন ও ধারদেনা নিয়ে মাছ ধরার প্রস্তুতি নেন। কেউ জাল, ট্রলার ও জ্বালানি কেনার জন্য ঋণ করেন, আবার কেউ পাঁচ মাসের খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করেন ধারদেনা করে।

কোনো কোনো জেলে মাছ ধরার প্রস্তুতির জন্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, মৌসুমের শুরু থেকেই মাছ আহরণ ও শুঁটকি বিক্রি করে বিনিয়োগের টাকা তুলে ঋণ পরিশোধ করবেন। কিন্তু মৌসুমের প্রথম থেকেই বৃষ্টি ও উত্তাল সাগর তাঁদের সেই প্রত্যাশায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

দীর্ঘদিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে মাছ আহরণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি সংগৃহীত মাছ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পর্যাপ্ত রোদ না পেলে মাছ শুকানো সম্ভব হবে না। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি শুঁটকির গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে জেলেদের ব্যক্তিগত লোকসানের পাশাপাশি মহাজন ও শুঁটকি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

 

সাত হাজারের বেশি জেলে সমবেত:

দুবলার চরের চারটি প্রধান শুঁটকি পল্লি হলো আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শেলারচর। এসব এলাকায় প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার জেলে মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির কাজে অংশ নেন।

আরও পড়ুন  বরিশালে মা ইলিশ সংরক্ষণে বিশেষ অভিযান: জব্দ জাল, আটক-৪

চলতি মৌসুমের শুরুতেই দুবলার চরে সাত হাজারের বেশি জেলে সমবেত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন মৎস্য ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও অন্যান্য পেশার মানুষ।

দুবলা ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মো. খলিলুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার রাত থেকে দুবলার চর এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে মৌসুমের শুরুতে আসা জেলেরা মাছ আহরণ ও বসবাসের জন্য অস্থায়ী ঘর তৈরিতে বাধার মুখে পড়েছেন।

দুবলা জেলে পল্লীর সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে জেলেরা চরে নেমে প্রয়োজনীয় স্থাপনা তৈরি করতে পারছেন না। অনেকেই নৌকা ও ট্রলার নিয়ে আশপাশের খালে আশ্রয় নিয়েছেন।

 

আট কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা:

দুবলার চরের শুঁটকি শিল্প শুধু জেলেদের জীবিকার উৎস নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখানকার উৎপাদিত শুঁটকির চাহিদা রয়েছে। খুলনা, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর ও রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বাজারে দুবলার শুঁটকি সরবরাহ করা হয়।

চলতি মৌসুমে দুবলার চরকেন্দ্রিক শুঁটকি পল্লি থেকে আট কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বন বিভাগ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে সাত কোটি টাকা। ওই বছর আদায় হয়েছিল প্রায় ৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

এবার মৌসুমের শুরুতেই মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম দ্রুত গতিশীল হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

 

জলদস্যুতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বড় উদ্বেগ:

বৈরী আবহাওয়ার পাশাপাশি শুঁটকি মৌসুমে জেলেদের অন্যতম বড় উদ্বেগ জলদস্যুতা, অপহরণ ও চাঁদাবাজি। মাছ আহরণ করতে গিয়ে গভীর সমুদ্র কিংবা সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে দস্যুদের কবলে পড়ার আশঙ্কা থাকে তাঁদের।

এ কারণে চলতি মৌসুমে জেলেদের নিরাপত্তায় বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুবলার চর, আলোরকোল, কটকা ও আশপাশের নদ-নদীতে নিয়মিত টহল ও নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় জেলেরা:

শুঁটকি উৎপাদনের জন্য মাছ আহরণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুকূল আবহাওয়া ও পর্যাপ্ত রোদ। টানা বৃষ্টি হলে মাছ শুকানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। অন্যদিকে উত্তাল সাগরে মাছ ধরতে না পারলে কাঁচা মাছের সরবরাহ কমে যায়। এই দুই সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে পুরো মৌসুমের উৎপাদন ও ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী দুর্যোগে শুধু জেলে নয়, মাছ ব্যবসায়ী, আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক এবং শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দুবলার চরের জেলেদের এখন একটাই প্রত্যাশা—দ্রুত বৈরী আবহাওয়া কেটে যাক, সাগর শান্ত হোক এবং স্বাভাবিকভাবে শুরু হোক মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন। পাঁচ মাসের জীবিকার স্বপ্ন নিয়ে সাগরপাড়ে আসা এসব মানুষের কাছে প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ। মৌসুমের শুরুতেই দুর্যোগের এই ধাক্কা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব পড়বে তাঁদের পরিবার, উপকূলীয় অর্থনীতি এবং দেশের শুঁটকি বাণিজ্যে।

সুন্দরবনের দুবলার চরে এখন তাই শুধু মাছ ধরার অপেক্ষা নয়, হাজারো জেলের অপেক্ষা প্রকৃতির অনুকূল হওয়ার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..