
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কর্তৃক আইনজীবী তালিকাভুক্তির বা নিবন্ধনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের সিদ্ধান্ত দেশের আইনি অঙ্গন ও সচেতন মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পেশার মানোন্নয়ন ও অবসরোত্তর প্র্যাকটিস রোধের অজুহাত দেখালেও, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের অভিমত—এটি একটি হঠকারী, অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ। মঙ্গলবার (২৭ অক্টাবর ২০২৬) এ বার কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এ সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা সুলভ আইনি সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থায় তীব্র সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। সম্প্রতি সচেতন নাগরিক সমাজ, আইন শিক্ষার্থী ও বিচারপ্রার্থী জনগণের পক্ষে এক যৌথ আবেদনের মাধ্যমে দেশের শীর্ষ নীতি-নির্ধারক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিলের জোর দাবি জানানো হয়েছে।

ছবি: বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
আন্তর্জাতিক নজির বনাম বাংলাদেশ:বিশ্বব্যাপী প্রচলিত আইন পেশার নজির তুলে ধরে বলা হয়, পৃথিবীর কোনো উন্নত বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে এমন কঠোর বয়সসীমা নেই।
যুক্তরাজ্য (UK): সলিসিটর বা ব্যারিস্টার হওয়ার জন্য কোনো বয়সসীমা নেই। জীবনের যেকোনো পর্যায়ে ডিগ্রি অর্জন করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্র্যাকটিস শুরু করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র (USA): যুক্তরাষ্ট্রের বার পরীক্ষাগুলোতে বয়সের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এমনকি ষাট বা সত্তর বছর বয়সেও আইন পেশায় প্রবেশের ভুরি ভুরি নজির রয়েছে।
ভারত (INDIA): ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইতিপূর্বে বার কাউন্সিলে বয়সসীমা আরোপের যেকোনো প্রচেষ্টাকে অসাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী বলে বাতিল ঘোষণা করেছে।
অথচ বাংলাদেশে সেশনজট, কর্মসংস্থানের সংকট ও সামাজিক প্রতিকূলতার কারণে তরুণদের পড়াশোনা শেষ করতে এমনিতেই বিলম্ব হয়। এমন বাস্তবতায় ৩৫ বছরের কৃত্রিম বাধা আরোপ করাকে চরম স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
আইনি অঙ্গনে চরম সংকটের আশঙ্কা:
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকলে আইনি সেবা খাতে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে:
১. আইনজীবী সংকট ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি: প্রত্যন্ত অঞ্চলে দক্ষ আইনজীবীর এমনিতেই অভাব রয়েছে। নতুন ও জীবন-অভিজ্ঞদের প্রবেশ আটকে দিলে আইনি সেবার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
২. সিন্ডিকেট সংস্কৃতি ও ব্ল্যাকমেইল: সীমিত সংখ্যক আইনজীবীর হাতে বিচারপ্রার্থীরা জিম্মি হয়ে পড়তে পারেন। অসাধু চক্রের অতিরিক্ত ফি আদায় ও দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হয়ে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হবে।
৩. অভিজ্ঞদের অবমূল্যায়ন: ব্যাংকিং, করপোরেট, শিক্ষা বা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিরা পরবর্তী জীবনে আইন পেশায় এসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিচারব্যবস্থা তাঁদের প্রজ্ঞা ও পরিপক্কতা থেকে বঞ্চিত হবে।
সাংবিধানিক ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন:বাংলাদেশের সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীন পেশা বা বৃত্তি গ্রহণের অধিকার রয়েছে। ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কেবল বয়সের অজুহাতে আইন পেশা থেকে বঞ্চিত করা সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, পেশাগত ক্ষেত্রে বয়সজনিত বৈষম্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার হরণের শামিল।
জরুরি দাবি ও প্রস্তাবনা:
আইন পেশা কোনো সাধারণ সরকারি চাকরি নয় যে নির্দিষ্ট বয়সে অবসরে যেতে হবে; এটি একটি স্বাধীন মুক্ত পেশা। তাই বিজ্ঞজনদের দাবি, বার কাউন্সিল কর্তৃক ঘোষিত ৩৫ বছরের বয়সসীমা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
বয়সের পরিবর্তে মানসম্মত বার কাউন্সিল পরীক্ষা ও যোগ্যতার মাধ্যমে পেশাগত মেধা যাচাইয়ের পূর্বনীতি বহাল রাখতে হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা – বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে ও দেশের জনগণের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান নতুন আইনজীবীদের জন্য “বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের বেঁধে দেয়া বয়সসীমা ৩৫ নির্ধারণের সিদ্ধান্তটি” বাতিলের বিষয়ে দেখবেন। একইসাথে স্বাধীনপেশা আইনজীবীতে প্রবেশে নজীরবিহীনভাবে বার কাউন্সিলের বয়স বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য ভূক্তভোগী নাগরিকরা মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
এছাড়া তারা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বিচারপ্রার্থী ও আইন পেশাকাঙ্ক্ষীদের স্বার্থে জনকল্যাণবিমুখ এ সিদ্ধান্ত থেকে দ্রুত সরে আসার জন্য মাননীয় আইনমন্ত্রীসহ বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।