বন রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত জনবল সংকটের অজুহাতে গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ ও বিট চলছে অতিরিক্ত দায়িত্বে। কোথাও দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই, আবার কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল অন্যত্র বসিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যেই কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জের মেদাকচ্ছপিয়া বিটে গত চার মাসে প্রায় ৫০০ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শুধু গাছ কাটাই নয়, বনভূমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে অর্থ নেওয়া, কাঠ পরিবহনের সময় জব্দ করা গাড়ি অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া এবং কাঠ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বনকর্মীদের যোগসাজশেরও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বনসংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তবে এসব অভিযোগের সবকটির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগে কক্সবাজার সদর, পিএমখালী, বাঁকখালী, জোয়ারিয়ানালা, মেহেরঘোনা, ঈদগাঁও, ফুলছড়ি ও ফাঁশিয়াখালী রেঞ্জ এবং সুন্দরবন নিয়ে প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। এর মধ্যে জোয়ারিয়ানালা, বাঁকখালী ও ফুলছড়ি রেঞ্জে কর্মকর্তা সংকটের কারণে অতিরিক্ত দায়িত্বে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে পিএমখালী রেঞ্জের সদর বিট ও তুতৌকখালী বিট, মেহেরঘোনা রেঞ্জের কালিরছড়া বিট, ঈদগাঁও রেঞ্জের পূর্ণগ্রাম বিট, ফুলছড়ি রেঞ্জের নাপিতখালী বিট এবং ফাঁশিয়াখালী রেঞ্জের মানিকপুর বিটেও জনবল সংকট রয়েছে বলে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। ফলে পাশের বিটের কর্মকর্তাদের নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
১১ মাসের মাথায় গুরুত্বপূর্ণ বিটে বদলি:
জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জের একটি শূন্য বিটে অন্যদের তুলনায় ভিন্ন চিত্রের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, পিএমখালী রেঞ্জে প্রায় ১১ মাস দায়িত্ব পালনের পর এনামুল হক নামে এক ফরেস্ট গার্ডকে জোয়ারিয়ানালা সদর বিটে বদলি করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই এলাকায় গাছ কাটার ঘটনা বেড়েছে।
তবে এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তার বক্তব্যও প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
বান্দরবানে ছয় ফরেস্টার, তবুও জনবল সংকট?
বান্দরবান বন বিভাগের থানচি রেঞ্জের বিশাল রিজার্ভ বনাঞ্চল দেখভালের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অথচ বান্দরবান সদর রেঞ্জে রেঞ্জ সহযোগী হিসেবে ছয়জন ফরেস্টার কর্মরত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তারা হলেন—ফরেস্টার মনিসুর রহমান, নুর হোসেন, জয়ন্ত কুমার রায়, জলিলুর রহমান, মোশাররফ হোসেন ও মোরশেদ কবির। বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দাবি, ছয়জনের মধ্যে দুজনের বদলির আদেশ হয়েছে।বান্দরবান বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলাম অবশ্য সদর রেঞ্জে জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, সেখানে প্রয়োজনীয় জনবলের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—একদিকে বিশাল বনাঞ্চল জনবল সংকটে থাকলে অন্যদিকে একাধিক ফরেস্টারকে একই কার্যালয়ে রেঞ্জ সহযোগী হিসেবে রাখার প্রশাসনিক যুক্তি কী?
মেদাকচ্ছপিয়ায় কাঠ পাচারের অভিযোগ:
ফুলছড়ি রেঞ্জের মেদাকচ্ছপিয়া বিটকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে গাছ কাটা ও কাঠ পাচার নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, খুটাখালী বাজার এলাকার একটি করাতকলের মালিক রমজানের সঙ্গে বনকর্মীদের যোগসাজশে বন থেকে গাছ কেটে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি মাসিক অর্থের বিনিময়ে কাঠ সংগ্রহের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।গত ১৬ সেপ্টেম্বর একটি গর্জন গাছসহ টমটম গাড়ি জব্দের ঘটনাকে কেন্দ্র করেও অভিযোগ ওঠে। গাড়িটির মালিকের দাবি, জব্দ করা গাড়িটি পরে ৩৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে মেদাকচ্ছপিয়া বিটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা রিপন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গাড়িটি তিনি নিজে জব্দ করেননি। তাঁর ভাষ্য, এটি তাঁর আগের সময়ের ঘটনা। কাঠ ব্যবসায়ী রমজানের কাছ থেকে মাসে ১৮ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, রমজান কখনো কখনো ১২ হাজার টাকা করে দিয়েছেন।
তিন মাসে ৫০ অবৈধ স্থাপনা:
সরেজমিনে মেদাকচ্ছপিয়া এলাকায় কয়েকজন ভিলেজার ও কমিউনিটি প্যাট্রোলিং গ্রুপের (সিপিজি) সদস্যের সঙ্গে কথা বলে বনভূমিতে নতুন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া যায়। তাদের দাবি, গত তিন মাসে এলাকায় প্রায় ৫০টি নতুন অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি স্থাপনা নির্মাণকারীর কাছ থেকে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, কিছু ব্যক্তির কাছ থেকে মামলা না দেওয়ার কথা বলে অর্থ নেওয়া হলেও পরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সম্প্রতি কয়েকজন টাকা ফেরত চাওয়ার জন্য বন কর্মকর্তাদের কাছে গিয়েছেন বলেও স্থানীয়রা জানান।তাদের আশঙ্কা, এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না হলে অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে এলাকায় সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
চার মাসে ৫০০ গাছ কাটার অভিযোগ:
মেদাকচ্ছপিয়া বিটের কোনাপাড়া বন এলাকায় গত চার মাসে প্রায় ৫০০টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, গাছ কাটার অভিযোগের বিষয়ে সদর সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) সরেজমিনে পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন। পরে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন সংশ্লিষ্ট বনকর্মী রিপনকে কৈফিয়ত তলব করেন। তবে কৈফিয়তের জবাবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সন্তুষ্ট হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়ে লিখিত কৈফিয়তের কপি বা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
বদলির আদেশ, তবুও দুই মাসেও অবমুক্ত নন:
আরেকটি অভিযোগ হলো, চট্টগ্রাম বন সংরক্ষক (সিএফ) গত জুলাইয়ে ফুলছড়ি রেঞ্জের মেদাকচ্ছপিয়া বিটে কর্মরত ফরেস্ট গার্ড রিপনকে চট্টগ্রামে বদলির আদেশ দেন। কিন্তু জনবল সংকটের কারণ দেখিয়ে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তাঁকে প্রায় দুই মাসেও দায়িত্ব থেকে অবমুক্ত করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।এদিকে বদলি আদেশ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং একই এলাকায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের সুযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি একটি মিটিংয়ে থাকার কথা জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান। পরে তাঁর বক্তব্যের জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।চট্টগ্রাম বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে-এর সরকারি নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
বন রক্ষায় কার্যকর নজরদারির দাবি:
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, জনবল সংকটের বিষয়টি বাস্তব হলেও তার সুযোগ নিয়ে বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি বা অনিয়ম হলে সেটি তদন্ত করা জরুরি। বিশেষ করে গাছ কাটা, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, কাঠ পরিবহন এবং জব্দ করা যানবাহন ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।তাদের মতে, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বদলি, দায়িত্ব বণ্টন, অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং দীর্ঘদিন একই এলাকায় অবস্থানের বিষয়গুলোও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা বের করা এবং সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে বনভূমিতে নতুন করে গাছ কাটা ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে কার্যকর নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।
এখন সচেতন নাগরিকদের উদ্বিগ্নতার বিষয় হল, ” জাতীয় সম্পদ বন সংরক্ষণে তাদের এ অভিযোগগুলো এখনই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত না করা হলে কক্সবাজার ও বান্দরবানের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।”