
আজ ‘বিশ্ব ব্যর্থতা দিবস’। নিজের কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ভুল ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করার দিন এটি।
১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ বিগত ৫০ বছরে অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে দৃশ্যমান কিছু সাফল্য অর্জন করলেও, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে রয়ে গেছে বড় ধরণের ব্যর্থতার ছাপ।
বিশেষ করে সংবিধান স্বীকৃত প্রধান মৌলিক অধিকার-শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সমতা ও মান নিশ্চিত করা যায়নি। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতার অর্ধেকেরও বেশি সময় পর মাধ্যমিক শিক্ষাকে সার্বজনীন বা সরকারি না করতে পারা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষাকে সরকারিকরণ করে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রম করলেও আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই মাধ্যমিক স্তরকে সম্পূর্ণ সরকারি ও অবৈতনিক ঘোষণা করেনি।
ব্রিটিশ আমলের এমপিওভুক্তি ব্যবস্থার অভিশাপ: আজও দেশে শিক্ষা পরিচালনায় ব্রিটিশ আমলের পুরানো ‘এমপিওভুক্তি’ (MPO) পদ্ধতি জিইয়ে রাখা হয়েছে। এটি মূলত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের আংশিক বেতন-ভাতা রাষ্ট্র কর্তৃক পরিশোধের একটি সাময়িক ব্যবস্থা ছিল, যা দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বিষফোড়ে পরিণত হয়েছে।
ব্যক্তিস্বার্থ ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট: মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ না হওয়ার অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো শিক্ষায় দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল। জাতীয়করণ হলে বিদ্যালয়ের অর্জিত সকল আয় সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হবে—এই ভয়ে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণীর প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদ এর বিরোধিতা করে থাকেন।
টিউশন ফির টাকা লুটপাট: সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দেওয়া এড়াতে এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া চড়া টিউশন ফি, সেশন ফি ও উন্নয়ন ফির কোটি কোটি টাকা নিয়ন্ত্রণ ও হরিলুট নিশ্চিত করতে এই সিন্ডিকেট এমপিওভুক্তি প্রথা টিকিয়ে রাখতে তৎপর। ফলে মানসম্মত শিক্ষা পাওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীর নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
মানসম্মত চিকিৎসা ও উচ্চ পকেট-খরচ: জিডিপির তুলনায় স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দ বিশ্বে সর্বনিম্ন দেশগুলোর অন্যতম। ফলে চিকিৎসা খরচের প্রায় ৭০% নাগরিকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়।
নিরাপদ খাদ্য ও বাসস্থান সংকট: দ্রুত নগরায়ণ হলেও নিম্নবিত্ত ও বস্তিবাসীদের জন্য টেকসই আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। খাদ্যে ভেজাল ও নিরাপদ পানির সংকট জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি।
সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার: সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বরাদ্দ সঠিকভাবে সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায় না এবং আইনের শাসন নিশ্চিতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা স্পষ্ট।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে নীতিগত অবহেলা: জাতীয় আয়ের তুলনায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে অনেক কম।
শিক্ষা প্রশাসনের দুর্নীতি ও তদারকির অভাব: নীতি নির্ধারণে ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পাওয়া এবং পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষকদের আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া।
দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যানের অনুপস্থিতি: শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির চেয়ে অবকাঠামোগত ভবন তৈরিতে বেশি মনোযোগ দেওয়া এবং বারবার কারিকুলাম পরিবর্তনের বিভ্রান্তি।
শিক্ষায় চরম বৈষম্য: সরকারি, বৈষম্যমূলক এমপিওভুক্ত এবং ব্যয়বহুল ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষায় ভাগ হয়ে সমাজে চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।
দক্ষতার ঘাটতি ও বেকারত্ব (Skill Mismatch): মানহীন মাধ্যমিক শিক্ষার প্রভাবে উচ্চশিক্ষিত হয়েও যুবসমাজ আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না, যা দেশে বিপুল বেকারত্ব সৃষ্টি করছে।
”ব্যর্থতাকে স্বীকার করে নেওয়া সমস্যাক্রান্ত অবস্থা থেকে উত্তরণের প্রথম ধাপ। স্বাধীনতার অর্ধশতক পর বৈষম্যহীন ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় নীতিতে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।”
মাধ্যমিক শিক্ষা একযোগে জাতীয়করণ: ব্রিটিশ আমলের এমপিওভুক্তি প্রথা চিরতরে বিলুপ্ত করে সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করতে হবে।
বিদ্যালয়ের আয় সরকারি কোষাগারে জমা: বিদ্যালয়ের সমুদয় টিউশন ফি ও অন্যান্য আয় সরাসরি সরকারি চালানের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কোষাগারে জমা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা, যাতে কোনো প্রধান শিক্ষক বা পরিচালনা পর্ষদ অর্থ লুটপাট করতে না পারে।
শিক্ষায় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা: শিক্ষা প্রশাসন ও বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎকারী শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা।
বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি: শিক্ষাখাতে জিডিপির অন্তত ৪%-৫% বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করে সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর শিক্ষার খরচ শূন্যে নামিয়ে আনা।
সবশেষে বিশ্ব ব্যর্থতা দিবসে আত্মসমালোচনা ও ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করাই হোক প্রধান কাজ। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারকে বাণিজ্য ও দুর্নীতির হাত থেকে মুক্ত করে, একমুখী ও অবৈতনিক মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল মুক্তিযুদ্ধের সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব।