
দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জনবসতির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালী চ্যানেলে রাতের আঁধারে প্রায় ১০ থেকে ১২টি ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে ম্যাক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত কারিগরি শর্ত উপেক্ষা করে ১৮ ইঞ্চি কাটার ড্রেজারের পরিবর্তে ১২ ইঞ্চি সাকশন ড্রেজার ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি অনুমোদিত এলাকার বাইরে বালু উত্তোলন এবং সন্ধ্যা ৬টার পর কার্যক্রম বন্ধ রাখার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বালু উত্তোলনের অনুমতি কি পরিবেশ, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ ও আদালতের নির্দেশনার ঊর্ধ্বে? রাতের অন্ধকারে একাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও অনুমতির শর্ত বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
গত ১৫ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে মহেশখালী চ্যানেলে সরেজমিনে গিয়ে একাধিক ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের দৃশ্য দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে চ্যানেলের স্বাভাবিক প্রবাহ, তীরবর্তী ভূমির স্থিতিশীলতা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং আশপাশের বসতবাড়ি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অনুমতির এক এলাকায়, উত্তোলন অন্য এলাকায়, অভিযোগের তির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দিকে
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাতারবাড়ী বন্দরের ব্যবহার্য সড়ক নির্মাণের জন্য ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে হামিদারদিয়া ও ঠাকুরতলা মৌজা থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, অনুমোদিত এলাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে মহেশখালী চ্যানেল, আদিনাথ পাহাড়সংলগ্ন মোহনা এবং বাঁকখালী খালের মোহনা থেকেও ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে ম্যাক্স গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা, উত্তোলনের প্রকৃত স্থান এবং অনুমোদনের শর্ত কী ছিল—তা সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অনুমোদিত মৌজার বাইরে বালু উত্তোলন হয়ে থাকলে তা অনুমতির শর্তের গুরুতর লঙ্ঘন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু উত্তোলনের পরিমাণ নয়, কোন কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে, কী ধরনের যন্ত্র দিয়ে এবং কোন সীমানার মধ্যে বালু তোলা হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের দাবি উঠেছে।
১৮ ইঞ্চির শর্তের জায়গায় ১২ ইঞ্চির ড্রেজার, রাতেও চলছে উত্তোলন:
বালু উত্তোলনের কারিগরি পদ্ধতি নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী ১৮ ইঞ্চি কাটার ড্রেজার ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে ১২ ইঞ্চি সাকশন ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টার পর বালু উত্তোলন বন্ধ রাখার শর্ত থাকলেও রাতের বেলায় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ১৫ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ এ বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।
তবে ১৮ ইঞ্চি ও ১২ ইঞ্চি যন্ত্রের ব্যবহারসংক্রান্ত শর্তটি কোন অনুমতিপত্র, কার্যাদেশ বা কারিগরি নির্দেশনায় রয়েছে, তা যাচাই করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট নথিতে এমন শর্ত থাকলে তা অমান্য করার অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ, এরপর সুপ্রিম কোর্টের আদেশ—বর্তমান অবস্থা কী?
মহেশখালী চ্যানেলসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে মহেশখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মো. জয়নাল আবেদীন হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ.এফ.এম. সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ভারুয়াখালী মোহনা, বাঁকখালী মোহনা ও মহেশখালী চ্যানেল থেকে চার মাসের জন্য ড্রেজিং ও বালু উত্তোলনের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য কক্সবাজারের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের আদেশের ওপর দুই সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দিয়ে ওই সময়ের মধ্যে রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন বলে দাবি করা হয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পর বর্তমানে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে কার্যকর আইনি অবস্থান কী? দুই আদালতের আদেশের সুনির্দিষ্ট ভাষা, পরবর্তী শুনানির ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো নির্দেশনা যাচাই না করে কার্যক্রমকে সরাসরি আদালতের আদেশ অমান্য বলে চিহ্নিত করা যাবে না। তবে আদালতের সর্বশেষ আদেশ ও অনুমতির শর্ত অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
পরিবেশের ক্ষতি হলে দায় নেবে কে?
মহেশখালী চ্যানেল ও আশপাশের মোহনা স্থানীয় জলপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য এবং তীরবর্তী জনবসতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অপরিকল্পিত ও অতিরিক্ত ড্রেজিংয়ের ফলে তলদেশের গঠন পরিবর্তন, তীরভাঙন, ভূমির স্থিতিশীলতা হ্রাস এবং জলজ পরিবেশে বিরূপ প্রভাবের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে আদিনাথ পাহাড়সংলগ্ন এলাকা ও জনবসতিপূর্ণ তীরবর্তী স্থানে বালু উত্তোলনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। কোথায় কত গভীরতায় বালু তোলা হচ্ছে, অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করা হয়েছে কি না এবং এর ফলে তীরবর্তী ভূমি বা বসতবাড়ি ঝুঁকিতে পড়ছে কি না—এসব বিষয়ে কারিগরি ও পরিবেশগত মূল্যায়ন জরুরি।
উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বালুর প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু সেই প্রয়োজন দেখিয়ে প্রাকৃতিক জলপথের ওপর অনিয়ন্ত্রিত চাপ সৃষ্টি করা কিংবা অনুমতির শর্ত উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও অনুমতির শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তের দাবি মহেশখালীবাসীর:
রাত ১১টার দিকে একাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগের পরও কার্যকর নজরদারি রয়েছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, অনুমোদিত এলাকার সীমানা সরেজমিনে নির্ধারণ, উত্তোলনের পরিমাণ ও ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি যাচাই, রাতের কার্যক্রমের প্রমাণ সংগ্রহ এবং আদালতের সর্বশেষ আদেশ পর্যালোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজন হলে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আইনসম্মত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।
একই সঙ্গে বালু উত্তোলনের অনুমোদনপ্রাপ্ত: প্রতিষ্ঠান, বাস্তবে কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার ভূমিকা স্পষ্ট করা জরুরি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য এবং জেলা প্রশাসনের ব্যাখ্যাও জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।
মহেশখালী চ্যানেল কোনো প্রতিষ্ঠানের একক সম্পদ নয়; এটি জনস্বার্থ, পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তাই রাতের আঁধারে বালু উত্তোলনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আদালতের সর্বশেষ আদেশের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং অনুমতির শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ক্ষতি কিংবা জনবসতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলার অভিযোগ কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত নয়।