• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৪ পূর্বাহ্ন
হেডলাইন:
রাজপথ থেকে Wrexham University’র মঞ্চ, MSc অর্জনের পরও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে তানভীর প্রেম দ্রোহের কবি রবি ডাকুয়ার সাড়া জাগানো কবিতা – “এখনই থেমে গেলে কেন?” সার বিক্রিতে অনিয়ম, ডিলারকে ৭ হাজার টাকা জরিমানা মাগুরায় বিএনপি নেতা মশিউর হত্যা মামলায় সাবেক ওসি বিপ্লব গ্রেপ্তার মানবতার সেবায় মোস্তফা হাকিম ব্লাড ব্যাংকের নতুন যাত্রা খুলনায় চাঞ্চল্যকর তুষার হত্যা মামলার আসামি আরিফ গ্রেফতার নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন সংবাদ প্রকাশের পর দৌড়ঝাঁপ: তড়িঘড়ি করে কলেজের চুরি করা জমি ফেরত দেয়ার চেষ্টা অধ্যক্ষের লগি-বৈঠা তাণ্ডবের ২০ বছর: পাটগ্রামে জামায়াতের বিশাল বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সভা পূর্বধলায় যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও রাজনীতির সমীকরণ: প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান ভাইস চ্যান্সেলর, দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক। / ১৪০ দেখেছেন
আপলোড : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতি পদটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ হলেও অলংকারিক ও মূলত নির্বাহী ক্ষমতাহীন। তবে এই অলংকারিক চরিত্রটি ধ্রুব থাকে কেবল স্বাভাবিক রাজনীতি ও সুশাসনের সময়কালে। যখনই রাষ্ট্রে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট, সাংবিধানিক অচলবস্থা বা ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তখনই এই পদটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত প্রজ্ঞা ও অভিভাবকত্বের প্রতীক। সংবিধানের চেতনা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অরাজনৈতিক, নির্দলীয় ও সবার শ্রদ্ধাভাজন হবেন—এমনটি প্রত্যাশিত হলেও বাস্তবে সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষ কোনো একক ‘সর্বজনগ্রাহ্য’ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া বর্তমান মেরুকৃত সমাজে প্রায় অসম্ভব। এই প্রেক্ষাপটে অতি-নিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন কোনো আমলা বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন করার সাম্প্রতিক গুঞ্জন দেশপ্রেমিক নাগরিক ও রাজনৈতিক সচেতন মহলকে গভীর উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

রাজনৈতিক বনাম অরাজনৈতিক রাষ্ট্রপতি: কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট

রাজনীতির অলিগলি না চেনা কোনো আমলা বা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিকে রাষ্ট্রে সর্বাধিনায়কের আসনে বসালে কী ধরনের কৌশলগত বিপত্তি ঘটতে পারে, তা তলিয়ে দেখা প্রয়োজন:

সংকটকালে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার অভাব: অরাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক ব্যাকগ্রাউন্ডের ব্যক্তিরা প্রশাসনিক প্রটোকলে দক্ষ হলেও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রায়শই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে তারা রাষ্ট্র ও দেশের বৃহৎ স্বার্থ রক্ষায় ত্বরিত ও সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন।

অতি-নিরপেক্ষতার ফাঁদ ও বুমেরাং প্রভাব: অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা নিজেদের ‘নিরপেক্ষ’ প্রমাণের মনস্তাত্ত্বিক চাপে থাকেন। ফলস্বরূপ, চরম রাজনৈতিক সংকটকালে তারা এতটাই নমনীয় বা সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়েন যে, তা প্রকারান্তরে মূল রাজনৈতিক শক্তি ও দেশের স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধেই বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবমূল্যায়ন ও কর্মীদের হতাশা: জীবনভর রাজনীতি করে আসা, সততা ও ত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ জ্যেষ্ঠ নেতাদের টপকে কোনো আমলা বা সুবিধাভোগীকে সুযোগ দিলে তা রাজনীতিবিদদের জন্য চরম অবমাননাকর। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে এবং তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতি-বিমুখ করে তোলে।

অদৃশ্য শক্তির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার ঝুঁকি: রাজনৈতিক ভিত্তি না থাকায় একজন অরাজনৈতিক রাষ্ট্রপতি অস্থিতিশীল সময়ে অসাংবিধানিক বা কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে সহজে রাজনৈতিক পাশা খেলার চালে পরিণত হতে পারেন।

ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার শিক্ষা

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংকটকালে একজন খাঁটি রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি এবং একজন অরাজনৈতিক রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি রাষ্ট্রের গতিপথ সম্পূর্ণ দুই বিপরীতমুখী ধারায় পরিচালিত করেছে।

আরও পড়ুন  ঈদুল আযহার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: জাকির হোসেন

ঘরোয়া প্রেক্ষাপট: ১৯৯৬ বনাম ২০০৭

বাংলাদেশের ইতিহাসেই এর দুটি উজ্জ্বল ও প্রত্যক্ষ উদাহরণ রয়েছে:

১৯৯৬ সালের প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞা: তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস ছিলেন একজন পাকা রাজনীতিবিদ। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধানের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানচেষ্টা তিনি অত্যন্ত সাহসিকতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তার সঙ্গে এক তুড়িতেই নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ার কারণেই তিনি প্রশাসনিক ও সামরিক মনস্তত্ত্ব বুঝতে পেরেছিলেন এবং রাষ্ট্রকে এক মহা বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিলেন।

২০০৭ সালের সিদ্ধান্তহীনতার ট্র্যাজেডি: বিপরীতে, ২০০৭ সালে মহামান্য ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন সজ্জন কিন্তু অরাজনৈতিক শিক্ষাবিদ। রাজনৈতিক কৌশলের জটিলতা না বোঝার কারণে তিনি অসাংবিধানিক শক্তির হাতের পুতুলে পরিণত হন। তার সিদ্ধান্তহীনতা ও অতি-নমনীয়তার সুযোগ নিয়ে তথাকথিত মইন-মাসুদ চক্র ক্ষমতা দখল করে এবং দেশকে দীর্ঘস্থায়ী গভীর রাজনৈতিক সংকটে ঠেলে দেয়।

আন্তর্জাতিক উদাহরণ: ভারত ও শ্রীলঙ্কা

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এই সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে। ভারতে যখনই বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে—যেমন নব্বইয়ের দশকের কোয়ালিশন রাজনীতির অস্থিরতা—তৎকালীন প্রণব মুখার্জি বা রামনাথ কোবিন্দের মতো প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। কারণ তারা রাজনীতি ও রাষ্ট্রের নাড়ি নক্ষত্র জানতেন।

অপরদিকে, শ্রীলঙ্কায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ ছিল রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন একচ্ছত্র প্রশাসনিক মানসিকতা, যা সংকটকালীন মুহূর্তে জনগণের স্পন্দন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভাষা বুঝতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।

অতএব, রাষ্ট্রপতি পদে কেবল একজন ‘ভোলাভালা’ বা ভালো মানুষ বসানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সততা, ত্যাগ এবং সংকট মোকাবিলার মতো সাহসী নেতৃত্ব। আমলাতান্ত্রিক মনোভাব দিয়ে আর যাই হোক, রাজনৈতিক ঝোড়ো হাওয়া মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। জাঁদরেল সাবেক আমলা, অনভিজ্ঞ প্রবাসী ব্যক্তিত্ব কিংবা অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসানোর চিন্তা ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ারই নামান্তর।

তাই চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, জাতীয়তাবাদী শক্তির মূলধারায় পরীক্ষিত, সৎ, সাহসী ও গভীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতৃত্বই রাষ্ট্রপতি পদের জন্য একমাত্র সঠিক ও যথোপযুক্ত বিকল্প। রাজনীতিকে রাজনীতিবিদের হাতে রাখাই রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান শর্ত।

লেখকঃ – প্রফেসর ড. আসিফ মিজান ভাইস চ্যান্সেলর, দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..