
লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ভারত থেকে আমদানীকৃত ভুট্টাবীজ নিয়ে চরম তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। মানহীন ও নকল বীজের আশঙ্কায় উপজেলার কৃষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসন একটি বীজের গোডাউন সিলগালা করে নমুনার নমুনা সংগ্রহপূর্বক পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছে। এদিকে জালিয়াতির প্রতিবাদে ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে সাধারণ কৃষকদের ব্যানারে শহরে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) শহরের চৌরাস্তা মোড়ে সাধারণ কৃষকদের ব্যানারে এক বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানবন্ধনে সাধারণ কৃষক, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা বলেন, কৃষকদের ঘাম ঝরানো উপার্জনে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া হবে না। অবিলম্বে নকল ও মানহীন বীজ কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন পাটগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি প্রভাষক মো: ইফতেখার আহাম্মেদ, সাধারণ সম্পাদক মো: সাইফুল ইসলাম সবুজ, কৃষক মো: জহির উদ্দিন মন্ডল, এনসিপি নেতা আনজুম রাজা, পাটগ্রাম বাজার ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা আলিনুর হক লাইজু, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী লালমনিরহাট জেলার সাবেক আমীর অধ্যাপক আতাউর রহমান, পাটগ্রাম উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব ওয়ালিউর রহমান সোহেল, পৌর বিএনপির সভাপতি মোস্তফা সালাউজ্জামান ওপেল, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিসমিল্লাহ ফাউন্ডেশন এর চেয়ারম্যান মো:আব্দুল আকবর বিন আফসার এবং জামায়াত নেতা মো: মাসুদ আলমসহ অনেকে।
জানা গেছে, পাটগ্রাম পৌর শহরের ‘বিজেতা সীডস (প্রা:) লিমিটেড’ নামের একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারতের চ্যাংড়াবান্ধার ‘গুহা ইন্টারন্যাশনাল’ থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ৬০ মেট্রিক টন ভুট্টাবীজ আমদানি করে। এর মধ্যে ৫ মেট্রিক টন বীজ আগেই বিক্রি করা হয়। অবশিষ্ট ৫৫ মেট্রিক টন বীজ পাটগ্রাম শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে কালিমন্দির সংলগ্ন একটি গোডাউনে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
গত শনিবার (১১ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে গোডাউনটিতে কোনো প্রকার স্বাস্থ্যবিধি ও মাননিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ‘বাহুবলী ৫৫৫’সহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় মোড়কে বীজ প্যাকেটজাত করা হচ্ছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে পাটগ্রাম উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিশাল দাশ সেখানে অভিযান চালিয়ে গোডাউনটি সিলগালা করেন।
অভিযান সম্পর্কে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিশাল দাশ জানান, সন্দেহজনক ও প্রক্রিয়াবহির্ভূতভাবে ভুট্টাবীজ প্যাকেটজাত করার কারণে গোডাউনটি সিলগালা করা হয়েছে। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ও সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা শেষে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কৃষি বিভাগের এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানান, সরকারি নীতিমালা ও বীজ আমদানির নির্ধারিত বিধিমালা অনুসরণ না করে এভাবে খোলা বা প্রক্রিয়াবিহীন বীজ আমদানি ও প্যাকেটজাত করার কোনো সুযোগ নেই।
বীজ কারবারে অব্যবস্থাপনা ও কৃষকদের কান্না
পাটগ্রাম বাজারের এক সার-বীজ ব্যবসায়ী জানান, বীজ প্যাকেটজাত করার আন্তর্জাতিক বা সরকারি সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। উন্নত সেন্টারে মাস্ক, গ্লাভস পরাসহ নির্দিষ্ট আর্দ্রতা বজায় রেখে বীজ জীবাণুমুক্ত করা হয়। কিন্তু সিলগালা করা গোডাউনটিতে এসব নিয়মের কোনো বালাই ছিল না।
এদিকে নিম্নমানের বীজ কিনে সর্বস্বান্ত হওয়ার অভিযোগ করেছেন সাধারণ কৃষকরা। জগতবেড় ইউনিয়নের এক কৃষক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “গত বছর বাহুবলী বীজ কিনে ভালো ফলন পাইনি। আমরা যেন নকল বীজ কিনে প্রতারিত না হই, প্রশাসনকে তা নিশ্চিত করতে হবে।”
পার্শ্ববর্তী হাতীবান্ধা উপজেলার কৃষকদের থেকেও একই ধরনের প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নার্গিস নাহার নামে এক নারী কৃষক ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, “মানুষের ১২ দোন জমি কন্ট্রাক্ট নিয়ে ‘বাহুবলী ৫৫৫’ জাতের ২৪ প্যাকেট বীজ লাগিয়েছিলাম। কিন্তু একটি বীজও গাজায়নি (অঙ্কুরোদ্গম হয়নি)।” তার মতো আরও অনেক কৃষক এই বীজে প্রতারিত হয়েছেন বলে জানান।
সার্বিক বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তা শামীমুর রহমান জানান, “সংগৃহীত ভুট্টাবীজের নমুনা রংপুর জেলা আঞ্চলিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। ল্যাব পরীক্ষার ফলাফল আসতে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে। পরীক্ষার রিপোর্ট পেলেই বীজের মান সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।”