
শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের ওপর মাথা রেখে,
অলস গেঁয়োর মতো এইখানে-কার্তিকের ক্ষেতে;
মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার
চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ
তার আস্বাদ পেয়ে পেকে ওঠে ধান…।
—জীবনানন্দ দাশ
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের এই অমর পঙুক্তির শৈল্পিক পথরেখা ধরে বাংলার প্রকৃতিতে এসেছে ঋতুর রানী হেমন্ত । আজ পহেলা কার্তিক । বাংলা ক্যালেন্ডারের নতুন পাতা উল্টে শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে হাজির হেমন্ত ।
প্রকৃতির আপন খেয়ালে সাজানো সবুজ শ্যামলী, ফিরোজা রূপালী রানীর বেশে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির হাতে হাত রেখে যুগ যুগ ধরে দাঁড়িয়ে এই আমাদের বাংলাদেশ । অপরূপ রূপ, রস গন্ধে ভরা পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ জীবনানন্দ দাশের এই রূপসী বাংলা । নির্মল ষড়ঋতুর মোহময় ঐশ্বর্যে প্রতিনিয়ত সে মুগ্ধ করে আমাদের সৃষ্টশীল মননকে । গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত আর বসন্তের পরিক্রমায় মনের মাধুরীতে সাজানো চারদিক যেন মোহবিষ্ট এক কাননের কুসুমকলি । স্ব মহিমায় নিজেদের আগমন বার্তা দিয়ে বাংলার প্রকৃতির এই ষষ্ঠ তনয়া মিলনের অপরূপ সুরের মালায় গেঁথে রাখে বংশপরম্পরায় ।
এদের মধ্যে হেমন্ত চতুর্থ । শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা আর শ্বেতশুভ্র কাশের দল যখন খানিকটা থিতিয়ে আসে, তখনই কুয়াশার চাদর গায়ে শিশিরের নুপুর পায়ে কণ্ঠে শিউলির মালা পরে নিজের পট সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে হেমন্ত । বিশাল ধানক্ষেতের এক প্রস্তর জমিনে সবুজের গালিচা বিছিয়ে অনন্য এক আবেশ ছড়িয়ে দখল নেয় প্রকৃতির । এ যেন শিল্পীর রঙিন ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা আবহমান বাংলার পরম্পরা ।
হেমন্তের অন্যতম অনুষঙ্গ শিশির । সারা দিনের রাজত্ব শেষে সূর্য যখন মিইয়ে যাওয়া আলো নিয়ে পাটে নামে, তখনই প্রকৃতিতে লাজুক বালিকার মতো উঁকি দিতে শুরু করে শিশিরকণা, গাছের পাতা, ধানক্ষেত, সবুজ মেঠোপথ, ঘাসের বুকে সে জমে ওঠে বিন্দু বিন্দু আকার নিয়ে । উষার সোনালী রোদ পেয়ে যা হয়ে ওঠে একেকটা মুক্তোর দানা । ভোর রাতে গ্রামীণ টিনের চালে শিশিরের ফোঁটা যেন গান গেয়ে যায় আপন ছন্দে । যা দেখে উদাসী কবিমন গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে কত গান, মনের কোণে উঁকি দেয় কাব্যের পঙক্তিমালা ।

সুন্দর এই হেমন্তে প্রকৃতির পরতে পরতে নিজের রূপের কুঞ্জ সে রচনা করে নিপুণ ছোঁয়ায় ! রূপসী ঋতুর রানীর মোহিনী আঁচলের সর্বজনীন নকশার অনুসঙ্গ মাতাল করা সুবাসিনী শিউলি ফুলের দল । কার্তিক-অগ্রহায়নের রঙিন ক্যনভাসের পাকা হাতের মুনসিয়ানায় পূর্ণতার এক অনন্য তুলির শেষ আঁচড় ক্ষণজন্মা এই পুষ্পরাশির । তাই তো এর অপূর্ব প্রেমের মোহে মোহিত হয়ে নজরুলের মতো বিদ্রোহী মননে কোমলতার আলোড়ন তুলে জন্ম নেয় শিউলিমালার মতো বাংলার কালজয়ী সাহিত্যকর্ম ।শুধু সুবাসিনী শিউলিই নয়, হেমন্তের রাজকুঞ্জে নিত্যদিনের শোভা বিলায় শাপলা, শালুক, গন্ধরাজ, কামিনী, মল্লিকা, ছাতিম, বকুলের মতো অসংখ্য ফুলপরীর দল ।
একই সাথে হেমন্ত প্রাচুর্য আর সমৃদ্ধির ঋতু, বাংলার গোলা ভরা ধানের সূতিকাগার । এখন কার্তিকে মাঠ জুড়ে যে সবুজ ধানক্ষেতের জোয়ার, অগ্রহায়নে তা ছেয়ে যাবে সোনালি আভায় । পাকা ধানের ম ম গন্ধে ভরে উঠবে বাংলার আকাশ বাতাস । হেমন্তকে বলা হয় নবান্নের ঋতু । হেমন্ত বন্দনার অংশ হিসাবে পাড়ায় পাড়ায় সাড়া জাগে উৎসবের । নতুন চালের হরেক রকম পিঠা পায়েশ আর নানা আয়োজন বাঙালিয়ানায় ভরে দেয় দৈনন্দিন ছান্দিক কর্মের পরিধি ।
বাংলার শ্যামলিমার এই রাজ্যপটে সমৃদ্ধি আর সুন্দরের আলোকছটা বিলাতে বিলাতে হেমন্ত নিজেকে শীতের কাছে সপে দেওয়ার প্রস্তুতি নেয় । তবুও ষড় ঋতুর প্রকৃতিতে হেমন্তের উপস্থিতি সর্বজনীন । তাই সে নিজস্ব সৃষ্টিতে, বৈশিষ্ঠ্যে, রূপে, রঙে, বিলাসিতায় বাংলার হারিয়ে যাওয়া কালের গর্ভে স্মৃতির পদচিহ্ন আঁকে নিরন্তর । তাই তো সে আপন সৃষ্টির গরিমা নিয়ে বারবার ফিরে আসে এই জসীমউদদীনের মায়ার সুতোয় বাঁধা পল্লী ছায়ায় মোড়ানো বাংলার পথে প্রান্তরে । তার এই রাজকীয় আগমন এবং বিদায় রাগিনীর মোহিনী সুর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয় কাল থেকে কালান্তরে । চাইলেও যা অগ্রাহ্য করতে পারে না বাংলার প্রতিটি ধুলিকণা, পারি না আমরাও ।
—গনি মিয়া