• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪১ অপরাহ্ন
হেডলাইন:
বরিশালে জেলেপল্লীর মৎস্যজীবীদের মানবেতর জীবনযাপন: বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি আত্রাইয়ে উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির মাসিকসভা অনুষ্ঠিত  বুড়িচংয়ে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে পরিবহনে তল্লাশি; আটক-৩ রাজপথ থেকে Wrexham University’র মঞ্চ, MSc অর্জনের পরও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে তানভীর প্রেম দ্রোহের কবি রবি ডাকুয়ার সাড়া জাগানো কবিতা – “এখনই থেমে গেলে কেন?” সার বিক্রিতে অনিয়ম, ডিলারকে ৭ হাজার টাকা জরিমানা মাগুরায় বিএনপি নেতা মশিউর হত্যা মামলায় সাবেক ওসি বিপ্লব গ্রেপ্তার মানবতার সেবায় মোস্তফা হাকিম ব্লাড ব্যাংকের নতুন যাত্রা খুলনায় চাঞ্চল্যকর তুষার হত্যা মামলার আসামি আরিফ গ্রেফতার নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

লাল বুকের প্রেম ও ধূসর অপরাহ্ন: উত্তর আটলান্টিকের থ্রি-স্পাইনড স্টিকলব্যাকের জীবনগাথা

মোঃ শরিফুল ইসলাম / ৫০ দেখেছেন
আপলোড : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

 

উত্তর আটলান্টিকের কনকনে ঠান্ডা জলরাশির নিচে নীরবে রচিত হয় এক মহাকাব্যিক নাট্যমঞ্চ। সেখানে নায়ক কোনো বড় আকারের তিমি বা হিংস্র হাঙ্গর নয়; মাত্র দুই-তিন ইঞ্চির এক ক্ষুদ্র প্রাণী-‘তিন কাঁটাওয়ালা স্টিকলব্যাক’ (Gasterosteus aculeatus)। বসন্তের আগমনে এই ক্ষুদ্র মাছটির শরীরে যে জাদুকরী পরিবর্তন ঘটে, তা প্রজননের প্রাক্কালে যৌবনের চরম আকর্ষণ ও উন্মাদনাকে যেমন সামনে আনে, তেমনি প্রজনন-পরবর্তী চরম ক্লান্তি ও মলিনতার এক নির্মম বাস্তবতার গল্পও শোনায়। জীবনের এই মেলোড্রামা অনেক অংশেই প্রজননকেন্দ্রিক মানব আচরণের মনস্তাত্বিক প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে ধরে।

 

রূপান্তরের যৌবন:

রঙের সাজ ও নীড় তৈরি: বছরের অন্য সময়ে স্টিকলব্যাক মাছের দেহ থাকে সাধারণ রুপালি-ধূসর রঙের, যা তাদের শিকারিদের চোখ থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। কিন্তু বসন্ত আসার সাথে সাথেই পুরুষ মাছের হরমোনে ঘটে যায় এক তীব্র বিস্ফোরণ। তাদের বুক ও গলা টকটকে উজ্জ্বল লাল বর্ণ ধারণ করে, আর চোখগুলো জ্বলে ওঠে ফিরোজা নীল আভায়।
​যৌবনের এই সাজ কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং এক প্রকার শারীরিক সক্ষমতার বিজ্ঞাপন।
পুরুষ স্টিকলব্যাক জলজ উদ্ভিদ, শ্যাওলা এবং কিডনি থেকে নিঃসৃত এক বিশেষ আঠা দিয়ে জলের তলে সুন্দর সুড়ঙ্গ আকৃতির বাসা (Nest) তৈরি করে। এই বাসা কেবল ডিম রাখার জায়গা নয়, তার স্থপতি দক্ষতার পরিচয়ও বটে।

​মানব আচরণের সাথে সামঞ্জস্য: মানুষও যৌবনে প্রজনন ও সঙ্গী আকর্ষণ করতে বাহ্যিক রূপচর্চা, শারীরিক ফিটনেস এবং নিজস্ব সামাজিক স্ট্যাটাস বা ‘বাসস্থান’ তৈরির প্রতি চরম মনোযোগী হয়। স্টিকলব্যাকের লাল বুক যেমন নারীর কাছে তার সুস্থতার বার্তা দেয়, মানুষের সমাজেও ঠিক তেমনই স্বাস্থ্য, আকর্ষণ ও নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষমতা প্রজননসঙ্গী পাওয়ার মূল শর্ত হয়ে দাঁড়ায়।

​

যৌনতার নাটকীয়তা ও বৈচিত্র্যপূর্ণ নৃত্য:

​বাসা প্রস্তুত হলে শুরু হয় সঙ্গী আকর্ষণের পালা। পুরুষ স্টিকলব্যাক তখন একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নেশায় মত্ত হয়ে ওঠে। সীমানা রক্ষায় অন্য পুরুষদের সাথে জড়ায় তীব্র প্রতিযোগিতায়। কোনো নারী স্টিকলব্যাক কাছে এলে পুরুষটি এক বিশেষ ধরনের ‘জিগ-জ্যাগ নৃত্য’ (Zig-zag dance) শুরু করে। ক্ষিপ্র গতিতে তরঙ্গের মতো সাঁতার কেটে সে নারী মাছটিকে নিজের তৈরি বাসায় আমন্ত্রণ জানায়।

​

ছবিতে: লাল পুরুষ স্টিকলব্যাকের যৌন আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তার বাসায় চলে এসেছে এক স্ত্রী স্টিকলব্যাক।

 

যোগ্যতমের জয় ও নারী স্টিকলব্যাকের সঙ্গী যাচাই  :

​সঙ্গী নির্বাচন ও পরখ: নারী স্টিকলব্যাক পুরুষটির লাল রঙের তীব্রতা এবং বাসার বুনন নিখুঁত কি না তা ভালোভাবে পরখ করে। রঙ যত লাল, সে পুরুষটির প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং যৌন স্বাস্থ্য তত ভালো বলে বিবেচিত হয়।

​বহুগামী কৌশল: একটি নিখুঁত বাসায় একাধিক নারী ডিম পাড়ে। পুরুষটি প্রতিটি নারীকে কৌশলে বাসায় নিয়ে আসে এবং ডিম্বাণু নিষিক্ত করে। আবার কোনো কোনো শক্তিশালী পুরুষ অন্য প্রতিবেশীর বাসার ডিম চুরি করে নিজের বাসায় এনে নারী মাছকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করে।
​মানব আচরণের সাথে সামঞ্জস্য: মানুষের প্রেমের নানা জটিল মনস্তত্ত্ব ও প্রজনন সংগ্রামের সাথে এর গভীর মিল রয়েছে। সঙ্গী নির্বাচনে যোগ্যতা যাচাই, প্রতিদ্বন্দীকে টেক্কা দেওয়ার প্রবণতা এবং সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে বৈচিত্র্যময় উপস্থাপন বা পারফরম্যান্সের বিষয়টি মানব সমাজেও প্রকটভাবে দৃশ্যমান।

​

পিতৃসত্তা ও প্রজনন শেষের নির্মম মলিনতা:

​ডিম পাড়া শেষ হতেই নারী স্টিকলব্যাকের কাজ শেষ; সে প্রস্থান করে। এবার শুরু হয় পুরুষ স্টিকলব্যাকের একাকী লড়াই। নিষিক্ত ডিমগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের জন্য সে একটানা দিন-রাত পাখনা দিয়ে জলে বাতাস তৈরি করে (Fanning)। একই সাথে শিকারিদের আক্রমণ থেকে ডিম ও সদ্যোজাত পোনাদের রক্ষা করতে ২৪ ঘণ্টা পাহারা দেয়।
​এই সময় পুরুষ মাছটি খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ করে দেয়। কয়েক সপ্তাহের এই নিরবচ্ছিন্ন ধকল, মানসিক চাপ এবং অনাহারে একসময়ের সেই তেজস্বী, উজ্জ্বল রক্তবর্ণ পুরুষ মাছটি ধীরে ধীরে তার গায়ের রঙ হারিয়ে ফেলে। টকটকে লাল বুক ফ্যাকাসে, মলিন ও ধূসর হয়ে যায়।

 

প্রজননের শেষে পুরুষ স্টিকলব্যাকের বুকের লাল বর্ণে মলিনতা (গণচিঠি)

 

আরও পড়ুন  অল্প পুঁজিতে স্বল্প পরিশ্রমে পরিত্যক্ত পুকুরে কলমি চাষ : সফলতার গল্প ‎

অধিকাংশ ক্ষেত্রে, সন্তানরা স্বাধীনভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করার পর প্রজনন-পরবর্তী চরম শারীরিক অবক্ষয়ের কারণে পুরুষ মাছটি মৃত্যুবরণ করে বা একেবারে নিস্তেজ হয়ে অবশিষ্ট জীবন কাটায়। যে যৌবন শুরু হয়েছিল লাল রঙের উৎসব দিয়ে, তা শেষ হয় ধূসর এক অবসন্নতায়।

মানব আচরণের সাথে সামঞ্জস্য: সন্তানের লালন-পালন ও সুরক্ষায় মা-বাবার চরম আত্মত্যাগ মানুষের সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য। প্রজনন ও পরবর্তী প্রজন্মাকে লালন-পালন করতে গিয়ে মানুষ যেভাবে নিজের যৌবন, শক্তি ও রূপ উৎসর্গ করে বার্ধক্য বা মলিনতার দিকে ধাবিত হয়—স্টিকলব্যাকের জীবন চক্র যেন তারই এক সংক্ষিপ্ত জলজ সংস্করণ।

​

এক অনবদ্য প্রাকৃতিক বাস্তবতা:
​উত্তর আটলান্টিকের এই ক্ষুদ্র জীবটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতিতে বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি কেবল একটি শারীরিক জৈবিক ক্রিয়া নয়; এটি আত্মত্যাগ, নাটকীয়তা ও পরম সহনশীলতার এক জটিল মিশ্রণ। যৌবনের সেই লাল রঙের উন্মাদনা আর প্রজনন শেষে অবক্ষয়ের মলিনতা—জীবজগতের এই সার্বজনীন নিয়মটি স্টিকলব্যাক ও মানবসমাজকে একই সুতোয় গেঁথে দেয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..