• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৮ অপরাহ্ন
হেডলাইন:
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে বিতর্কের ঝড়: বাতিলের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ ধর্মপাশায় জমি নিয়ে বিরোধ ও সালিশে জোরপূর্বক টিপসই নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ বেনাপোল আইসিপি সীমান্তে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য আটক বদলি ও ৯ম পে-স্কেলসহ ৩ দফা দাবিতে মাঠে নামছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা আত্রাইয়ে জাতীয় শিশু-কিশোর ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ দিনাজপুরে নিরাপত্তার দাবিতে এমপির বাসা ও থানায় নারীদের অবস্থান নওগাঁর সাপাহারে বর্ণাঢ্য আয়োজনে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন পরিবারিক আয় বৃদ্ধি করতে শ্যামনগরের কৃষকদের হাঁস-মুরগি পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ গাজীপুরে পিবিআই কর্মকর্তা আলতাফের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ

এম এন লারমা সমসাময়িক সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন: ড. আমেনা মহসিন

পপেন ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি: / ৪৭ দেখেছেন
আপলোড : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সমসাময়িক সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রহমান মিলনায়তনে বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। ‘জাত্যভিমানী সংবিধানের খেরোখাতায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটি-২০২৬।

আলোচনা সভায় ড. আমেনা মহসিন বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সময় পাহাড়িদের যে সংকট ছিল, বর্তমানেও তা রয়েছে। সে সময় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি ভিন্ন একটি জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে একাই তাদের অধিকারের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অধিকার ও সংবিধানের বিভিন্ন ত্রুটি নিয়ে কথা বলেছিলেন। এ কারণে তিনি তাঁর সমসাময়িক সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিএনপির ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব, সেটি একটি প্রশ্ন। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামে কতটা গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে, সেটিও আলোচনায় আনা প্রয়োজন।

সভায় গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী ড. ঈশিতা দস্তিদার বলেন, বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অধিকারসংক্রান্ত অতি ক্ষুদ্র বিষয়গুলোর সঙ্গেও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন সম্পৃক্ত। তাঁর দর্শন কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়। বর্তমান সময়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বিভিন্ন জনপদ যখন সংকটে পড়ছে, তখন লারমার পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিষয়ক চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, বিএনপি ও তারেক রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে স্পষ্টতা নেই, বরং সেখানে ধোঁয়াশা রয়েছে। তাঁর মতে, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জাতীয়তাবাদী দর্শন ছিল অধিকতর স্পষ্ট ও বৈজ্ঞানিক। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে, লারমা ১৯৭২ সালেই সংবিধান প্রণয়নের সময় গণপরিষদে সে ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলেছিলেন।

তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি ও ‘রেইনবো নেশন’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে নতুন করে নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের অর্থ সম্পাদক মেইনথিন প্রমীলা বলেন, রাষ্ট্র যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করুক, আদিবাসীরা আদিবাসীই। বিভিন্ন ন্যারেটিভ তৈরির মাধ্যমে আদিবাসীদের রাষ্ট্রীয় অধিকারকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের দখলদার চরিত্রের পরিবর্তন হয় না। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য হলেও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন পর্যালোচনা করা উচিত।

আরও পড়ুন  খাগড়াছড়ির কামিনী পাড়ায় বৈসু উপলক্ষে গঙ্গাপূজা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম অনুষ্ঠান

লেখক, গবেষক ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নির্দিষ্ট কিছু সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক ব্যক্তির বাণিজ্যিক স্বার্থের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সেখানে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুনাফা অর্জন করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিকীকরণ ও সেটেলার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিলেও প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান দর্শনের মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা পালন করা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। গণপরিষদের বিতর্ক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও কলামিস্ট ড. মারুফ মল্লিক বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সংবিধানে চাপিয়ে দেওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদ কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি রাষ্ট্রে বহুত্ববাদী অন্তর্ভুক্তির পথে অন্তরায়। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সময় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার উত্থাপিত দর্শন বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রের জন্যও প্রাসঙ্গিক। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পুরোনো ভুলগুলো সংশোধনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক পাভেল পার্থ। তিনি বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন বাংলাদেশের সংবিধানের ‘আলাম’-এর মতো, যা চাকমাদের বুননশিল্পের প্রতীকী ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বাঙালি ছাড়া অন্যান্য জাতিসমূহের অস্তিত্ব অস্বীকারের মাধ্যমে রাষ্ট্র বাঙালি কর্তৃত্ববাদের জাত্যভিমানী চরিত্র প্রকাশ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পাভেল পার্থ বলেন, লারমার সংবিধান দর্শনে জুমচাষ, কৃষি, রাজস্ব আদায়, উৎপাদন ব্যবস্থায় কৃষির ভূমিকা, পরিবেশ-প্রতিবেশ, শোষিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং নারী প্রশ্নসহ বিভিন্ন বিষয় স্থান পেয়েছে। এসব বিষয় একটি বৈজ্ঞানিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত, যা বর্তমান সময়েও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান শাসনামলে কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের ফলে বিশাল জনপদ, চাষযোগ্য ভূমি, শস্য ও প্রাকৃতিক প্রতিবেশ ধ্বংস হওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব লারমার পরিবেশ ও সমাজভাবনায় প্রতিফলিত হয়েছিল।
আদিবাসী স্বীকৃতির প্রসঙ্গে পাভেল পার্থ বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আদিবাসীদের অস্তিত্ব জাতিসংঘের কোনো চাপিয়ে দেওয়া ন্যারেটিভের বিষয় নয়; এর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে আদিবাসীদের ভূমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক উদাহরণ তুলে ধরেন। তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশে আদিবাসী-বাঙালির ঐতিহাসিক সম্প্রীতি অস্বীকার করে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’সহ নানা পরিচয়ের বাইনারি ন্যারেটিভের মাধ্যমে রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চাইছে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটি-২০২৬-এর সদস্য সচিব মনিরা ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন গবেষক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক ও আদিবাসী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
আলোচনা সভাটি সঞ্চালনা করেন উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব মনিরা ত্রিপুরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন..